কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট, নেই আইসিইউ সুবিধা

মমিনুর রহমান, রংপুর : কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট, নেই আইসিইউ সুবিধা। ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, আট তলা নতুন ভবন। সম্প্রতি সীমিত পরিসরে হলেও হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা সুবিধাও যোগ হয়েছে। কিন্তু করোনা মহামারির সময়েও চিকিৎসক সংকটে ধুঁকছে হাসপাতালটি। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসক মাত্র ১৪ জন। নেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। ফলে করোনা সংক্রমণ বাড়লেও রোগীরা পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা। এমনই অবস্থা ২৫০ শয্যার কুড়িগ্রাম সদর জেনারেল হাসপাতালের।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন ভবন, ২৫০ শয্যার যাবতীয় সুবিধা ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসকসহ অবেদনবিদ না থাকায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও আইসিইউ সুবিধা পাচ্ছেন না কুড়িগ্রামের রোগীরা। সরকারি হাসপাতাল তো বটেই; জেলার বেসরকারি পর্যায়ের কোনও
হাসপাতালেও আইসিইউ সুবিধা নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুরুতর অসুস্থ কোনও রোগীর উন্নত চিকিৎসা কিংবা আইসিইউর জন্য ৫৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে রংপুর যেতে হয়। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে গেলেও জেলার সংকটাপন্ন রোগীর জীবন রক্ষা নিয়ে বাড়ছে সংশয়।

হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০ শয্যার কুড়িগ্রাম হাসপাতাল পরবর্তী সময়ে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার পর হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের জন্য ২০১৩ সালে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে এটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পেতে শুরু করে।

প্রায় চার বছর ধরে মেডিসিন ও ডাইটসহ অন্যান্য সুবিধা পেলেও শুরু থেকেই চিকিৎসক সংকটে রয়েছে হাসপাতালটি। ফলে প্রায় ২২ লক্ষাধিক জনসংখ্যার জেলার মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও হাসপাতালে মাত্র ১৪ জন চিকিৎসক কর্মরত। অথচ ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য বিভিন্ন পদে ৬৫ জন চিকিৎসকের চাহিদা পাঠানো হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ছয়টি পদ থাকলেও হাসপাতালটিতে কোনও ইমারজেন্সি মেডিক্যাল কর্মকর্তা নেই। ২০টি পদের বিপরীতে বিভিন্ন বিভাগের কনসালট্যান্ট রয়েছেন নয়জন। ইএনটি, চক্ষু, চর্ম ও যৌন, রেডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগে কোনও কনসালট্যান্ট নেই। আটটি পদের বিপরীতে ইনডোর মেডিক্যাল কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র একজন। আর মেডিক্যাল অফিসারের ১০টি পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র তিনজন। নেই অবেদনবিদ, রেডিওলজিস্ট ও প্যাথলজিস্ট। রোগীর চাপ সামলাতে অনেক সময় উপ-সহকারী মেডিক্যাল কর্মকর্তা (সেকমো) দিয়ে জরুরি বিভাগ ও আউটডোর চালানো হয়।

চিকিৎসক সংকটে স্বাস্থ্যসেবার চরম দুরবস্থার কথা স্বীকার করে হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. পুলক কুমার সরকার বলেন, ‘আমরা হিমশিম খাচ্ছি। এর মধ্যে কোভিড আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।’ রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালটির কোভিড ইউনিটের বেড সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮০ করা হয়েছে জানিয়ে আরএমও বলেন, ‘৩ জুলাই পর্যন্ত কোভিড ইউনিটে ৬৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে ২০ জনেরঅবস্থা অস্থিতিশীল। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসক সংকটের কারণে ওই ইউনিটে (প্রতি ১২ ঘণ্টায়) মাত্র একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন।’

রোগী বাড়ায় সেবা দিতে চিকিৎসকদের কষ্ট হচ্ছে জানিয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘চিকিৎসক চেয়ে ও আইসিইউ সুবিধার জন্য আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে চাহিদা দিচ্ছি। তারা শুধু আশ্বাস দিচ্ছেন। এমন অবস্থায় কোনও রোগীর আইসিইউর প্রয়োজন হলে তাকে রংপুর পাঠাতে হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ‘আমাদের আইসিইউ সুবিধা সম্পন্ন কোনও অ্যাম্বুলেন্সও নেই। ফলে ঝুঁকি থাকলেও প্রয়োজনের কারণে রোগীকে রংপুরেই যেতে হচ্ছে।’জেলায় কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও আইসিইউ সুবিধা মিলছে না এমন ইঙ্গিত দিয়ে সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আইসিইউর জন্য আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে চাহিদা দিচ্ছি। কিন্তু জনবল সংকট এবং সরঞ্জামের অভাবে এই সুবিধা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষের কাছে আইসিইউর চাহিদা দিলে আমরা প্রশাসনিকভাবে সুপারিশ করবো। এছাড়াও তিনি উক্ত মহামারীর দুঃসময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিগণকে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহবান জানান।

মন্তব্য

মন্তব্য