শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না

বাংলা ট্রিবিউন  :  শুধু রাজধানীর নামিদামি প্রতিষ্ঠান নয়, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দেশের অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধেও এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক মাসে ডজন খানেক প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, জাল সনদে শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ  বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমরা যখনই অভিযোগ পাচ্ছি তখনই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির ক্ষমতা অনেক। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের জবাবদিহিতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আইনগত এখতিয়ার শিক্ষা বোর্ডের। পুরাতন আইন ও নীতিমালা সংশোধন করা প্রয়োজন। তাহলে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসবে। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনিয়ম-দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো বেশি চোখে পড়ে। কারণ রাজধানীর এই দুই প্রতিষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে দেশের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দুর্নীতি নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম নয়।
সূত্রমতে, বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার ডুমুরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ রানার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে জেলা প্রশাসনের তদন্তে। গত ১১ ডিসেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বরিশালের বরিশাল টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মো. সেলিম মৃধার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গত ২৪ ডিসেম্বর।
ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার চুউরিয়া মুন্সী রহিম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। এ ব্যাপারে গত ৬ ডিসেম্বর কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ।
কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির বিদ্যালয়ের ভালো ফলাফলের জন্য সরকারের দেওয়া এক লাখ টাকা প্রণোদনা ভাতা আত্মসাৎ করেছেন। এ অভিযোগে গত ১১ ডিসেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ পরিদর্শন ও নীরিক্ষা অধিদফতরের পরিচালককে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বোয়ালী দারুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে ওই প্রতিষ্ঠানের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. রওশন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ ডিসেম্বর কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার কেজিএস মহর সোবহান মফিজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসএম জুলফিকার আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্টের (সেকায়েপ) উদ্দীপনা পুরস্কারের অর্থ বিতরণে অনিয়ম করেছেন। এই অভিযোগের কারণ দর্শানোর নোটিশ করে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বেতন-ভাতা কেন বন্ধ করা হবে না তা জানাতে বলা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালককে।
রাজধানীর তেজগাঁও মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হেলেনা খাতুনের বিরুদ্ধে ভবন নির্মাণসহ উন্নয়ন কাজে অর্থ তসরুপের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগে গত ১ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার জিরুইন বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম এবং নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস করা হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটি এই অনিয়ম করেছে বলে অভিযোগ করেছেন সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ছায়েদুল ইসলাম। এই অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ১ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিলেটের বিয়ানিবাজার উপজেলার মাথিউরা সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আবদুল আলিম কম বয়সে দাখিল পাস করেছেন, এছাড়া নির্ধারিত অভিজ্ঞতা ছাড়াই উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে প্রমাণ না হওয়ায় গত বছর ১১ নভেম্বর তাকে এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈইড় তাড়াশিয়াপাড়া দাখিল (ভকেশনাল) এবতেদায়ি বিভাগ, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার খালবলা বাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

মন্তব্য

মন্তব্য