টঙ্গীতে তাবলিগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষ নিহত ১, আহত দুই শতাধিক

 অনলাইন ডেস্ক : টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে গতকাল শনিবার দিনভর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। ইজতেমা ময়দান ও এর আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এ সংঘর্ষে এক মুসল্লি নিহত এবং উভয় পক্ষের দুই শতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন। জোড় ইজতেমাকে কেন্দ্র করে তাবলিগ জামাতের দিল্লির নিজামউদ্দিন মারকাজের মাওলানা সাদ গ্রুপ এবং ভারতের দেওবন্দের কওমিপন্থী মাদরাসার অনুসারী ঢাকার কাকরাইল মারকাজের মুরব্বি মাওলানা জুবায়ের গ্রুপের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। বিকেল পর্যন্ত টঙ্গী ও এর আশপাশের এলাকায় এ সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। সংঘর্ষে নিহতের নাম ইসমাইল হোসেন মণ্ডল (৭০)। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার মিলিয়াপাড়া গ্রামে। তিনি মাওলানা সাদ গ্রুপের অনুসারী বলে টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি এমদাদুল হক জানিয়েছেন। এ সংঘর্ষের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কোনো ধরনের ইজতেমা আয়োজন বন্ধ থাকবে। নির্বাচনের পর ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
পুলিশ, তাবলিগের মুসল্লি ও স্থানীয়রা জানান, টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় ভারতের মাওলানা সাদের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে প্রায় বছর খানেক ধরে তাবলিগ জামাত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর জের ধরে উভয় পক্ষ বিশ্ব ইজতেমা শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে পৃথক তারিখ নির্ধারণ করে জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। সাদপন্থীরা ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী এবং জুবায়েরপন্থীরা ৭ ডিসেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী জোড় ইজতেমার ঘোষণা দেয়। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মুসল্লিদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
কয়েক দিন ধরে মাওলানা জুবায়েরপন্থীরা ইজতেমা ময়দানে অবস্থান নিতে শুরু করেন। তারা ইজতেমা মাঠের প্রবেশ পথের গেট বন্ধ করে লাঠিসোটা নিয়ে অবস্থান নেন এবং সাদপন্থীদের ইজতেমা ময়দানে প্রবেশে বাধা দেন। সাদপন্থী মুসল্লিরা শুক্রবার পর্যন্ত ময়দানে প্রবেশ করতে না পেরে আশপাশের বিভিন্ন মসজিদে অবস্থান নেন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে সাদপন্থীরা ঐক্যবন্ধ হয়ে ইজতেমা ময়দানে ঢুকার চেষ্টা করলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় ইজতেমা ময়দান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে মাওলানা জুবায়েরপন্থী কওমি মাদরাসা ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে সাদপন্থীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। এ সংঘর্ষ ইজতেমা ময়দান ছাড়াও আবদুল্লাহপুর ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এ সময় জুবায়ের অনুসারীরা ইজতেমা মাঠের টয়লেটের ছাদ থেকে বাইরে অবস্থানকারী সাদ অনুসারীদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এ সময় সাদ অনুসারীরাও পাল্টা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মাঝে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় সাদ অনুসারী কয়েক হাজার মুসল্লি গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি মো: এমদাদুল হক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা সকাল থেকেই ওই এলাকায় জলকামান ও সাঁজোয়া যানসহ অবস্থান নেন। সকাল থেকে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বেলা ১১টার পরপরই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে ময়দানের বাইরে থাকা মুসল্লিরা ফটকের তালা ভেঙে এবং সীমানা প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সংঘর্ষকালে ইট-পাটকেলে ও লাঠির আঘাতে উভয়পক্ষের দুই শতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। এই সংঘর্ষের ফলে ময়দানের পূর্ব পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক ও পশ্চিম পাশের টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে জনমনে আতঙ্ক নেমে আসে।
তাবলিগের সূরা সদস্য ও সাদপন্থীদের অন্যতম মুরব্বি সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম জানান, প্রতি বছরের মতো এবারো তারা বিশ্ব ইজতেমা শুরুর আগে ইজতেমা ময়দানে জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। সেই অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু ৩০ নভেম্বর জোড় ইজতেমায় যোগ দিতে আসা কয়েক হাজার মুসল্লি ইজতেমা ময়দানে ঢুকতে গেলে মাওলানা জোবায়ের অনুসারীরা তাদের বাধা দেন। কয়েকদিন আগে থেকেই তারা লাঠিসোটা নিয়ে ময়দানে প্রবেশের ফটকগুলো বন্ধ করে দিয়ে সেখানে অবস্থান নেন। ফটক দিয়ে তারা কাউকেই ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করতে দেননি। শনিবার ভোরে সাদপন্থীরা ময়দানে প্রবেশ করতে গেলে জুবায়েরপন্থীদের বাধার মুখে পড়েন। এ সময় জুবায়ের অনুসারীরা সাদ অনুসারীদের ওপর হামলা চালান ও মারধর করেন। এতে এক মুসল্লি নিহত ও কয়েক শ’ আহত হন। তিনি জুবায়ের অনুসারীদের মাঠ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
অপর দিকে প্রতিপক্ষের মাওলানা জুবায়ের গ্রুপের মুরব্বি মো: মাহফুজ জানান, ৭ ডিসেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়। এ ঘোষণা শোনে সাদপন্থীরা ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। এ নিয়ে উভয়পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই পক্ষকে ডেকে নির্বাচনের আগে জোড় ইজতেমা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানায়। সেখানে উভয় পক্ষই ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। কিন্তু সরকারের কাছে দেয়া তাদের দেয়া প্রতিশ্রুত ভঙ্গ করে সাদপন্থী কয়েক হাজার মুসল্লি শনিবার ভোরে ইজতেমা ময়দানে জোড় ইজতেমা করার জন্য ঢোকার চেষ্টা করেছেন এবং ফটকে ফটকে জড়ো হয়েছেন। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক দক্ষিণ জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার থোয়াই অংপ্রু মারমা বলেন, ইজতেমা ময়দানের বাইরে কয়েক হাজার মুসল্লি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেয়ায় এবং তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বিঘিœত ও যানজটের সৃষ্টি হয়। বেলা সোয়া ১টার দিকে ধীরগতিতে গাড়ি চলাচল শুরু হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা জোনের উপ-কমিশনার নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, টঙ্গীতে তাবলিগের দুই পক্ষের মুসল্লিদের সংঘর্ষের কারণে বিমানবন্দর সড়কের এক দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো: পারভেজ হোসেন জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় এ হাসপাতালে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শতাধিক মুসল্লিকে চিকিৎসা দেয়া হয়। আহত মুসল্লিদের নিয়ে আসা ক্রমাগত বাড়ছে।
এদিকে আমাদের বিশেষ সংবাদদাতা জানান, টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কোনো ধরনের ইজতেমা হবে না। ইলেকশন পর্যন্ত ইজতেমার জন্য সব প্রস্তুতি সভা বা জোড় ইজতেমা কিংবা ইজতেমার জন্য সব ধরনের কার্যকলাপ দেশব্যাপী বন্ধ থাকবে। নির্বাচনের পর ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করা হবে। তবে ইজতেমা বন্ধ হচ্ছে না, শুধু তারিখ পরিবর্তন হচ্ছে। তবে এখন থেকে ইজতেমার মাঠ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
গতকাল ইজতেমার প্রস্তুতি সভা নিয়ে টঙ্গীতে একজন নিহত হওয়ার পর বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিবদমান দু’পক্ষের সাথে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। এর আগে তাবলিগ জামাতের দু’পক্ষের সাথে বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এতে দিল্লি মারকাজের মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভিপন্থী বাংলাদেশে তাবলিগের শুরা সদস্য সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম এবং তাদের বিরোধী কওমিপন্থী মাওলানা জুবায়েরের পক্ষ থেকে তাবলিগের উপদেষ্টা মাওলানা আশরাফ আলী ও আবদুল কুদ্দুসসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো: আছাদুজ্জামান মিয়াসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদও উপস্থিত ছিলেন।
বেলা ৩টায় বৈঠক শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষ আসতে দেরি করে। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সভাস্থলে আসেন সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, মাওলানা জুবায়েরের পক্ষ থেকে নেতৃবৃন্দ বিকেল পৌনে ৫টায় এলে বৈঠক শুরু হয়।

সূত্র : নয়া দিগন্ত 

মন্তব্য

মন্তব্য