গাজীপুরে তাবলিগ জামাতের দু-গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত ১ ॥ আহত দুই শতাধিক

সাইফুল আলম সুমন,নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

গাজীপুরের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে জোড় ইজতেমাকে কেন্দ্র করে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের কয়েক হাজার মুসল্লির মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে একজন নিহত ও উভয় পক্ষের প্রায় দুই শতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন। নিহত ইসমাইল হোসেন (৭১) মুন্সিগঞ্জ জেলার মিলিয়াপাড়া গ্রামের খলিল মন্ডলের ছেলে। সে মাওলানা সাদ’র অনুসারী। টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদুল হক নিহতের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। এসময় ইজতেমা মাঠে থাকা প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক মনিরা বেগম বিকেল সাড়ে তিনটায় বলেন, প্রায় দেড়’শ মুসল্লীকে তারা চিকিৎসা দিয়েছেন এবং এখনও নতুন আসা আহতদের চিকৎসা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে গুরুতর আহত ২৫ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কুর্মিটোলা হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

 

উল্লেখযোগ্য আহতরা হলেন, আব্দুর রাজ্জাক(৩০), আবু তালেব (৩৫), নূর হোসেন (১৫), মাওলানা মাসুদুর রহমান (৩৫), ইমরান (৩৫), সফিকুল ইসলাম (৩০), মো. শামীম মাতব্বর (৪৯), মো. শেখ আব্দুর রব (৮৪), রাসেদ (৩০), মো. জালাল খান(৫০), রুস্তম আলী (৪০), সোলায়মান আকন্দ (৫৫) প্রমূখ।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাওলানা সা’দ অনুসারী তাবলীগ জামাতের মুসল্লীরা শনিবার ফজরের নামাজের পর থেকে ইজতেমা মাঠে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এসময় ভেতরে থাকা মাওলানা জুবায়ের অনুসারী তাবলীগ জামাতের মুসল্লী ও মাদ্রাসার ছাত্ররা তাদেরকে ভেতের প্রবেশে বাধা দেয়। এতে সা’দ অনুসারীরা টঙ্গী-কামারপাড়া সড়কে অবস্থান গ্রহণ করে তাসবীহ তাহলিম ও বয়ান করছিলেন। এসময় পুলিশ সদস্যরা ভেতরে ঢুকে জুবায়ের অনুসারীদের সাথে কথা বলতে থাকেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বেলা ১১টার দিকে ইজতেমা মাঠের টয়লেটের ছাদ থেকে জুবায়ের অনুসারী ছাত্ররা বাইরে অবস্থান নেয়া সা’দ অনুসারীদের ওপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে সা’দ অনুসারীরা তাদের ওপর নিক্ষেপ করা ইটপাটকেল দিয়ে পাল্টা জুবায়ের অনুসারীদের ওপর হামলা করে। এক পর্যায়ে সা’দ অনুসারীরা ইজতেমা মাঠে প্রবেশ করলে দু পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সংঘর্ষে মুসল্লী ও মাদ্রাসা ছাত্ররা আহত হয়। বিকেল তিনটার দিকে গাজীপুর মেট্রাপলিটন ও র‌্যাব সদস্যরা ইজতেমা মাঠে সর্বশেষ অবস্থান করা সা’দ অনুসারীদেরও বের করে দিয়ে মাঠটি মুসল্লীমুক্ত করে দেন।

 

ঢাকা মোহাম্মদপুরের বসিলা হাফেজী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নূর হোসেন (১৫) জানায়, সে গত বুধবার ইজতেমা মাঠে আসে মাঠ তৈরীর কাজ করতে। তার সাথে আরও সহপাঠী ইজতেমা মাঠে জড়ো হয়। একই মাদ্রাসার সিয়াম ও ওমর ফারুক জানায়, তারা আগে কোনোদিন তাবলীগ জামাতে অংশ নেননি। বুধবার ইজতেমা মাঠে এসে এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

টঙ্গী কামারপাড়া রোডের চা বিক্রেতা সোহাগ ও রাকিব জানান, জোবায়ের পন্থির মুসুল্লীরা বুধবার রাত থেকে ইজতেমা ময়দানের ভিতরে অবস্থান নেয়। তারা শুক্রবার সকালে ইজতেমা ময়দানে প্রবেশের সব গেট বন্ধ করে দেয়। বাহিরের সাধারাণ মুসুল্লীদেরকেও তারা ইজতেমা মাঠে জুম্মা’র নামাজ আদায় করতে ইজতেমা মাঠে ঢুকতে দেয়নি।

 

তারা আরো জানান, শনিবার ফজরের নামাজের আগে থেকে মাওলানা সাদপন্থি মুসুল্লীরা ইজতেমা মাঠের চার দিকে টঙ্গী বাটা গেট ও কামাড়পাড়া রোডে তজবিহ্ ও কিতাব হাতে অবস্থান নেয়। পরে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ইজতেমা মাঠের ভিতর থেকে সাদপন্থি মুসুল্লীদের উদ্দেশ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে ওই ইটপাটকেলগুলো সাদপন্থি মুসুল্লীরা পাল্টা জোবায়ের পন্থির মুসুল্লীদের নিক্ষেপ করে। এতে উভয় পক্ষের প্রায় শতাধিক মুসুল্লী মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আহত হয়।

 

সা’দ অনুসারী ঢাকার শান্তিনগরের মাওলানা রুহুল আমীন বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন জেলার মাননীয় জেলা প্রশাসকগণ দুই পক্ষকে জেলায় জেলায় এবং ইজতেমা মাঠে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে দুই ভাগে জামাত আয়োজনের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। দেশের সকল জেলায় এমনকি কাকরাইল মসজিদেও দুইভাগে কার্যক্রম চলছে। অথচ তারা সরকারের সিদ্ধান্ত না মেনে বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে বিশ্ব ইজতেমা মাঠে এনে সরকারী নির্দেশ অমান্য করছে। তারা সা’দ অনুসারীদের ইজতেমা মাঠে প্রবেশ করতে বাধা ও মাঠ থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে।

 

রুহুল আমীন বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও সা’দ অনুসারীরা বিশ্ব ইজতেমা শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু ৩০ নভেম্বর জোড় ইজতেমায় যোগ দিতে আসা কয়েক হাজার মুসুল্লি ইজতেমা ময়দানে ঢুকতে গেলে দেওবন্দ কওমিপন্থী মাওলানা জুবায়েরের অনুসারী বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্ররা তাদের বাধা দেন। গত কয়েকদিন ধরে কওমি মাদরাসা থেকে বিপুল সংখ্যক ছাত্র বিচ্ছিন্নভাবে ইজতেমা ময়দানে অবস্থান নেয়। তারা সা’দ পন্থীদের কৌশলে মাঠ থেকে সরানোর চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়।

 

গত কয়েকদিন আগে থেকেই লাঠি-সোটা নিয়ে কয়েক হাজার ছাত্র বিচ্ছিন্নভাবে ময়দানে ঢোকার ফটকগুলো বন্ধ করে সেখানে অবস্থান নেন তারা। শুক্রবার জোড় ইজতেমায় যোগ দিতে আসা মুসুল্লিরা ময়দানে ঢুকতে না পেরে আশপাশের মসজিদে অবস্থান নেন। শনিবার (১ ডিসেম্বর) ভোরে আবারও তারা ময়দানে ঢুকতে গিয়ে জুবায়ের পন্থীদের বাধার মুখে পড়েন।

 

অপরদিকে, প্রতিপক্ষের দেওবন্দ (জোবায়ের) কওমিপন্থী তাবলিগ মুরুব্বী মাওলানা শরীফুল ইসলাম জানান, ৭ ডিসেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর তাদের জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা শুনে সাদপন্থীরা ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিলে নিজ নিজ পক্ষের প্রতিনিধিদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডেকে নিয়ে নির্বাচনের আগে জোড় ইজতেমা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়। সেখানে উভয় পক্ষই ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তারপরও সা’দ অনুসারী কয়েক হাজার তাবলিগ মুসুল্লি শনিবার ভোরে জোড় ইজতেমা করার জন্য ময়দানে ঢোকার চেষ্টা করেন।

 

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদুল হক জানান, ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা ইজতেমা মাঠে অবস্থান করছে। ইজতেমা ময়দানে পুলিশ র‌্যাবসহ পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বিকেল তিনটার দিকে মাঠ থেকে সকল মুসল্লীদের বের করে দেয়া হয়েছে। র‌্যাবের হেলিকপ্টার টহল অব্যাহত রয়েছে।

 

গাজীপুর মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের দক্ষিণ জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার থোয়াই অংপ্রু মারমা বলেন, ইজতেমা ময়দানের বাইরে কয়েক হাজার মুসুল্লি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেয়ায় যানবাহন চলাচল বিঘিœত হয়েছে। দুপুর ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ থাকে।

 

এব্যাপারে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর জানান, স্থগিতকৃত ইজতেমা পরবর্তী তারিখ দুই পক্ষের সমজোতার ভিত্তিতে করা হবে। নির্বাচনের মুহূর্তে কোনো ভাবে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হোক এধরনের কোন কর্মকান্ড চলতে দেয়া হবে না। ইজতেমা ময়দানের পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন থাকবে বলেও জানান তিনি।

মন্তব্য

মন্তব্য