মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরোধ তুঙ্গে,বিভক্তিকে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি-জামায়াত

 

গাজী শামীম আহমেদ,সাতক্ষীরা //
সাতক্ষীরা-২ (সদর) আসনে মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরোধ তুঙ্গে। সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগের এ বিভক্তিকে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি-জামায়াত। অপরদিকে মাঠে দেখা না গেলেও মনোনয়ন পেতে দৌড়-ঝাপ শুরু করেছেন বিএনপির চারজন। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশিও ৪জন। প্রতিক নিয়ে নির্বাচন করতে না পারলেও বসে নেই জামায়াত। ভোটার ও কর্মীদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে সাতক্ষীরা-২ (সদর) আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৩লাখ ৫৬ হাজার। এরমধ্যে নারী ভোটার ১লাখ ৭৯ হাজার ও পুরুষ ভোটার ১লাখ ৭৭ হাজার। ২০১৩ সালে সাতক্ষীরা-২ আসনে আওয়ামী লীগের মীর মোস্তাক আহমেদ রবি নৌকা প্রতিকে বিজয়ী হন। তিনি ৩২ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছাইফুল করিম সাবু পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ভোট। ২০০৮ সালে এ আসনে জয়ী হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির এম এ জব্বার। তিনি পেয়েছিলেন ১লাখ ৩৩ হাজার ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব জামায়াতের মাওলানা আব্দুল খালেক মÐল পেয়েছিলেন ১লাখ ১৪ হাজার ভোট। আর ২০০১ সালে মাওলানা আব্দুল খালেক মÐল ১লাখ ২৪ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। সেবার আওয়ামী লীগের নজরুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ভোট। ৮৬,৯১ ও ৯৬ সালে নির্বাচিত হন জামায়াতের কাজী শামসুর রহমান। বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোতে দেখা যায়, এ আসনে সবসময়ই জামায়াতের প্রভাব সুস্পষ্ট। ৭৩ সালের পর ২০১৪ সালে এ আসনে নৌকা প্রতীক জয়ী হয়। তবে আধিপত্য বিস্তার,জেলা পরিষদের নির্বাচন, সবশেষ জেলা পরিষদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলা আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতার দ্ব›দ্ব,স্থানীয় সংসদ সদস্যের সাথে জেলা নেতাদের বনি-বনা না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে দল গোছাতে ব্যর্থ হয়েছেন ক্ষমতাসীনরা। মাস চারেক আগে নিউ মার্কেট মোড়ে দলীয় জনসভায় সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির লোকজনের হাতে লাঞ্চিত হন জেলা যুবলীগের আহবায়ক আব্দুল মান্নান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির মামলায় জেলহাজতও খাটতে হয়েছে তাকে। জেলা পরিষদের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহমেদ। তবে তিনি পরাজিত হন বিদ্রোহী প্রার্থী সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের কাছে। সেই থেকে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ জেলার দুই শীর্ষ নেতার। সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের সাথে কখনো সুসম্পর্ক ছিলনা সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশায় নজরুল ইসলামের গণসংযোগ শুরু করলে চরমে উঠে তাদের সম্পর্ক। সম্প্রতি সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে নজরুল ইসলামকে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মীর মোস্তাক আহমেদ রবি। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যান তিনি। তিনভাগে বিভক্ত নেতা-কর্মীরাও হতাশ হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় পত্রিকাগুলো বেশ ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ করে। তবে জনসমর্থন আদায়ে কাজ করছেন নেতারা। সাতক্ষীরা পৌরসভা এখন পোস্টারের শহর। শুধু শহর নয়, জনগণকে শুভেচ্ছা জানাতে নানা রঙের পোস্টার শোভা পাচ্ছে গ্রাম-গঞ্জেও। ছোট ছোট সভা সমাবেশে এসব প্রার্থীরা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি দলের অঙ্গসংগঠনের সমর্থন নেয়ার কাজে ব্যস্ত। গেল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী জামায়াত-বিএনপির অংশ গ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহমেদ রবি। তিনি বলেন, স্বাধীনতার বহুদিন পরে সাতক্ষীরা সদর আসনে সর্বপ্রথম আমি নৌকা প্রতীকে জয়লাভ করেছি। নির্বাচিত হয়ে বাইপাস সড়ক নির্মাণ, ভোমরা স্থলবন্দরে কোয়ারেন্টাম সেন্টার, জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অফিস,বিনেরপোতা কারিগরি প্রশিক্ষণ সেন্টারসহ বহুবিধ উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হব। সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ¦ মো: নজরুল ইসলাম জানান, আমি সদর আসনে নৌকা প্রতীকে ২০০১ সালে নির্বাচন করেছি। তাছাড়া দীর্ঘদিন আমি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে সাধারণ মানুষের সেবা করে আসছি এবং আমি সার্বক্ষনিকভাবে তাদের পাশে রয়েছি। সাধারণ মানুষের আশীর্বাদে আমি সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। তাদের দেয়া এ দায়িত্বের মাধ্যমে আমি স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সাথে সেবা করে যাচ্ছি। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নৌকা প্রতিকে নির্বাচনের সুযোগ দেয়া হলে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হব বলে আশা করি। আওয়ামী লীগের আরেক প্রার্থী সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান বাবু জানান, যারা এলাকায় থাকেনা, যেসব নেতারা তৃণমুল থেকে আসেনি, চাকরি দেয়ার নামে বিপুল পরিমাণে আর্থিক সুবিধা গ্রহণকারি এসব নেতাদের আগামী নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ নেই। হাইকমান্ডের এমন ম্যাসেজের ভিত্তিতে তৃণমুল পর্যায়ে নির্বাচনের কাজ করে চলেছেন তিনি। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বেশ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে সাতক্ষীরা-২ আসনে। বর্তমান সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতার অভিযোগ প্রায়ই করেন অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশিরা। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত হোসেন অভিযোগ করে বলেন,বর্তমান সংসদ সদস্য সাতক্ষীরার রাজনীতিতে নতুন মুখ। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরে তিনি কোন নেতা-কর্মীকে তোয়াক্কা করেননা। মহাজোটের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী জাতীয় পার্টিও। এপ্রসঙ্গে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজাহার হোসেন বলেন,সাতক্ষীরার ৪টি আসনেই জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রস্তুত। মহাজোটের সাথে থাকলেও সবকটি আসনেই প্রার্থী চাইবেন। তিনি বলেন,মহাজোটের পক্ষ থেকে সাতক্ষীরা সদর আসনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। জাতীয় পার্টি থেকে আরো যারা মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন,তারা হলেন-জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান আশু, আনোয়ার জাহিদ তপন ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মাতলুব হোসেন লিয়ন। বসে নেই বিএনপি নেতৃবৃন্দ। কেন্দ্রঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচি সাতক্ষীরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তেমনভাবে পালিত না হলেও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে বেশ তৎপর জেলা পর্যায়ের বিএনপি নেতারা। মনোনয়ন পেতে ইচ্ছুক নেতারা হলেন,জেলা বিএনপি’র সভাপতি রহমতুল্লাহ পলাশ, সহ-সভাপতি আব্দুল আলিম, সহ-সভাপতি আব্দুর রউফ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ইফতেখার আলী। গণফোরামের জেলা সম্পাদক আলীনুর খান বাবুলও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা বাস্তবায়ন ও মনোনয়ন পেতে গণসংযোগ শুরু করেছেন। এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি রহমতুল্লাহ পলাশ জানান, এই আসনের মানুষ প্রার্থী দেখেনা, তারা প্রতীক দেখে। দলের দু:সময়েও পৌরসভায় মেয়র নির্বাচিত হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষ নিয়ে বিজয়ী হওয়ার কথা জানালেন বিএনপির এই নেতা।এছাড়াও প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক ও প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ, অপর যুগ্ন সম্পাদক শেখ সাহিদ উদ্দীন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ¦ শওকাত হোসেন এবং ভোরের পাতা সম্পাদক ও ব্যবসায়ী নেতা ড. কাজী এরতেজা হাসান জজ। মিনি পাকিস্থান হিসেবে কুখ্যাতি ছিল সাতক্ষীরার। দেশের যে ক’টি জেলা জামায়াতের ঘাটি হিসেবে পরিচিত তার মধ্যে সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা অন্যতম। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রæয়ারি জামায়াতের তাÐবে ক্ষত-বিক্ষত হয় এ জেলার জনপদ। সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক জামায়াত নেতারা। যদিও এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আব্দুল খালেক মÐল যুদ্ধাপরাধ মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সেক্ষেত্রে সাতক্ষীরা ২ আসনে প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক। নির্বাচন করতেই তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন বলে জানা গেছে।

 

মন্তব্য

মন্তব্য