বিশ্ব পর্যটন দিবসের ফিচার খৈয়াছড়া ঝর্ণার সৌন্দর্য আর কলতানে মন ছুয়ে যায়

হালিম সৈকত,কুমিল্লা
খৈয়াছড়া ঝর্ণা বাংলাদেশের একটি বিস্ময়কর ঝর্ণা। চট্টগ্রাম বিভাগের মিরসরাই বাতাবাড়িয়া খৈয়াছড়া এলাকায় অবস্থিত এটি একটি মনোমুগদ্ধকর ঝর্ণা। ভ্রমণপিয়াসু মানুষের কাছে খৈয়াছড়ার সৌন্দর্য তুলে ধরতে পারলে অচিরেই এটি হয়ে ওঠবে বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এখানে ছড়িয়ে আছে চিত্রশিল্পীর রংতুলির আচড়ে; মনে হবে এমনই। সবুজের চাদরে ঢাকা ঝর্নার রূপের আগুনে পুড়িয়ে মরতে হবে যারা যেতে পারবেন না সেখানে। নান্দনিক সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। সব সময় প্রকৃতি খেলা করে আপন মনে। ঝিরিঝিরি হাওয়া, সিরিসিরি হাওয়া ঢেউ তুলবে আপনার মনের গহীনে। ঝর্ণার বুমবুম শব্দ বেশ দূর থেকেই আপনার কানে এসে পৌছাবে। এই ঝর্ণার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর পানির প্রবাহ কখনো বন্ধ হয় না। সব সময় নিরবধি চলতে থাকে। হোক সেটা গ্রীষ্ম কিংবা শীতকাল। ঝর্ণাধারায় গা ভিজিয়ে নিজেকে সতেজ করতে এই ঝর্ণার জুড়ি নেই। এই ঝর্নাটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর মধ্যে রয়েছে ৯টি ধাপ। এছাড়া রয়েছে আরও অনেক গুলো ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ধাপ। আর এই জন্যই এটিকে বলা হয় ঝর্ণার রানী।
আকার আকৃতি এবং গঠনশৈলীর দিক থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্যতম বড় ঝর্ণার একটি। খৈয়াছড়া পাহাড়ে অবস্থিত বলে এটির নামকরন করা হয়েছে খৈয়াছড়া ঝর্ণা।
প্রতিদিন হাজার হাজার ভ্রমণপিয়াসু মানুষ ছুটে আসে এই ঝর্ণার সৌন্দর্য অবলোকন করতে। আমরাও ছুটে গেলাম সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে। অনেক দিনের ইচ্ছা থাকা স্বত্তে¡ও সময় ও সুযোগ ব্যাটে বলে হয়নি বলেই যাই যাই করে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অবশেষে ঠিক হল জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা কুমিল্লা জেলা কমিটি আনন্দ ভ্রমণে যাব। কিন্তু সব ঠিকঠাক থাকলেও বিপত্তি বাঁধল কর্ম। সময় বড় নিষ্ঠুর। যাবেন বলেই যেতে পারেন নি অনেকেই। আমরা ছিলাম নাছোড়বান্দা। ঠিকই গেলাম। মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে ঝর্নার অবস্থান। এর মধ্যে ১ কিলোমিটার পাকা রাস্তা সিএনজিতে যেতে পারবেন। এবং বাকি রাস্তা পায়ে হেঁটে যেতে হবে।
পাহাড়ের সবুজ রং আর ঝর্নার স্বচ্ছ জল মিলেমিশে একাকার হয়েছে প্রাকৃতিক জলপ্রপাত খৈয়াছড়া ঝর্ণায়। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে প্রায় ঘন্টা খানেক হাঁটলে দেখা মিলবে ঝর্ণার।
আপনি চাইলে উঠতে পারেন চেয়াম্যানের বাংলোতে। ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা বেশ দূর্গম এবং পাথরের জায়গা বেশ পিচ্ছিল। মারাত্মক কোন দূর্ঘটনা ঘটলে ওই দূর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা বেশ কঠিন হবে।
সেখানকার ব্যবস্থাপনা খুবই চমৎকার। বিশেষ করে খৈয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পুরো ইউনিয়নটিকে একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করছেন। ফেনী-চট্টগ্রাম রোড থেকে নেমেই চোখে পড়বে বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের সাইনবোর্ড চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সৌজন্যে। সিরিয়াল মেইটেন্ট করে সারি সারি সিএনজি থেকে সিএনজি নিয়ে সোজা চলে যাবেন স্পটে। ভাড়া নিবে জন প্রতি ২০ টাকা। ৫ জন ছাড়া সিএনজি যাবে না। মোট কথা প্রতি সিএনজির ভাড়া ১০০ টাকা। আসতেও একই অবস্থা। সেখানে নামলেই চোখে পড়বে একদল ছোট ছোট বাচ্চা বাঁশের লাঠি নিয়ে আপনাকে ডাকছে। প্রতিটি ৫-১০ টাকা। বাঁশ খুবই দরকারী। পাহাড়ে এবং ট্যাকিংয়ে আপনাকে সহায়তা দিবে। নিতে পারেন এ্যাংলেট। পিচ্ছিল পাথর বয়ে উপরে ওঠার জন্য এবং সুড়ঙ্গপথ পাড়ি দেবার জন্য।
আপনার ব্যাগ এবং মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার জন্য রয়েছে কতগুলো হোটেল এবং তাদের লকার। টাকা পয়সা দিতে হবে না। শুধু বিনিময়ে তাদের হোটেলে খাবার খেতে হবে। তাদের বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে। কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত। রয়েছে গোসল করার সুবিধা এবং বিশ্রামের জন্য রয়েছে সুবিন্যাস্ত খাট। এই জন্য তাদেরকে কোন পেমেন্ট দিতে হয় না। তবে রাতে অবস্থান করার কোন অনুমতি নেই সেখানে। চর্তুপাশে রয়েছে সিটিজেন চার্টারসহ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মোবাইল নম্বর। কোন সমস্যায় পড়লে কল দিতে পারেন তাদেরকে। হাইস, নোহা এবং প্রাইভেটকার পার্কিংয়ের জন্য দিতে হবে ৫০ টাকা এবং মোটর সাইকেলের জন্য ২০ টাকা।
যদি প্রথমবার গিয়ে থাকেন তাহলে নিতে পারেন পর্যটন গাইড। সেখানে মোট ১০ জন কমিটির নিবন্ধিত গাইড রয়েছে। সারা দিনের জন্য তাদেরকে দিতে হবে ৫০০ টাকা অথবা চুক্তি অনুযায়ী। পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা এই স্থানটি বাংলাদেশের একটি অনন্য পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে যদি সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং ঝর্ণায় যাওয়ার পথগুলোকে আরও মসৃণ করলে সেখানে প্রতিদিন পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকবে। সরকারও পাবে রাজস্ব। স্থানীয় কমিটির জোর তৎপরতার কারণে সেখানে কোন অপ-তৎপরতার কথা আজও শোনা যায়নি।

মন্তব্য

মন্তব্য