গণতন্ত্রের নেতা শহীদ ময়েজউদ্দিনের ৩৪ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী আগামীকাল

কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি //
শহীদ ময়েজউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের নিবেদিত সংগঠক, প্রথিতযশা আইনজীবী ও গণতন্ত্রের নেতা। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজসেবক-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কালীগঞ্জে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় কতিপয় চিহিৃত সন্ত্রাসীর হাতে ১৯৮৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর শাহাদাৎ বরণ করেন। কিন্তু দেশমাতৃকার জন্য জীবনদানের গৌরবময় উজ্জ্বলতায় মৃত্যু পরবর্তী সময় থেকে তিনি ‘শহীদ ময়েজউদ্দিন’ নামে সমধিক পরিচিত। আজ (২৭) সেপ্টেম্বর শহীদ ময়েজউদ্দিনের ৩৪ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী। এ উপলক্ষে উপজেলা আওয়ামীলীগ ও তার সহযোগী সংগঠন উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে দোয়া, মিলাদ মাহফিল দরিদ্র ভোজসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়হরা গ্রামে ১৯৩০ সালের ১৭ মার্চ মো. ছুরত আলী ও শহর বানুর ঘরে শহীদ ময়েজউদ্দিন জন্মগ্রহণ করেন।
কলেজে ছাত্র থাকা অবস্থায়ই তাঁর রাজনীতিতে হাতেগড়ি। ৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাÐে ওতপ্রোতভাবে তিনি জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই তিনি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসেন এবং বিশ^াসভাজন হয়ে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের হলে মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন আইনি লড়াই পরিচালনার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনা করার জন্য গঠিত মুজিব তহবিলের আহবায়ক হয়ে একজন বিচক্ষণ আইনজীবী ও রাজনীতিক হিসেবে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু পূর্ববাংলার জনগনের স্বাধীকার আন্দোলন নয় ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে মেঘালয় দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একযোগে কাজ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের পর বিভিন্ন পর্যায়ে দল ও সরকারকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য একজন সংসদ সদস্য হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। কালীগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে যথাক্রমে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং জাতীয় সংসদ সদস্য ১৯৭০ এবং ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ স্বপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হবার পর দলের চরম সংকটময় দিনগুলিতে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার দুরুহ দায়িত্ব পালন করেন। ১৫ই আগষ্টের নিমর্ম হত্যাকান্ডের পর বিশ^াসঘাতক খন্দকার মোশতাক কর্তৃক আহুত সংসদ সদস্যদের সভার সর্বপ্রথম তীব্র প্রতিবাদ করেন মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন। তাঁর বলিষ্ঠ এবং প্রতিবাদী দুঃসাহসিক ভূমিকায় উপস্থিত সকলেই সেদিন হতবাক হয়ে হয়েছিলেন। তিনি বৃহত্তর ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একই সময়ে তিনি ঢাকা মহানগর ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন।
১৯৪৮ সালে কালীগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষালয় ভাওয়াল রাজা রাজেন্দ্র নারায়ন (আরআরএন) উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা প্রথম বিভাগে পাস করেন। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫০ সালে প্রথম বিভাগ পেয়ে আই.এ পাস করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ১৯৫৩ সালে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে বি.এ (অনার্স) শেষে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এম.এ পাস করেন ১৯৫৫ সালে। ১৯৫৬ সালে সি.এস.এস (বর্তমানে বিসিএস) পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়েও সরকারি চাকরি না করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে এলএলবি পাস শেষে আইন ব্যবসা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই একজন খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

রাজনীতিবিদের পাশাপাশি সমাজসেবক হিসেবেও তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ রেডক্রস (বর্তমানে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট) সোসাইটির নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। একাধারে বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি (এফপিএবি)’র মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান প্যারেনহুড ফেডারেশন (আইপিপিএফ)-এর দক্ষিণ পূর্ব এশীয় অঞ্চলের কার্যকরি কমিটির সভাপতি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৮২ সালে সামরিক বাহিনী অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করলে দেশব্যাপি প্রতিবাদের ঝড় উঠে। ধাপে ধাপে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন প্রবল গণআন্দোলনে রুপ নেয়। মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন এ সময় অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকা গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জে চলে আসেন। ১৯৮৪ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বর সারাদেশে ২২ দল আহুত হরতালের মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় থানার সামনেরই তৎকালীন এরশাদ সরকারের লেলিয়ে দেওয়া কতিপয় সন্ত্রাসী তাঁর ওপর হামলা চালালে ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদৎ বরণ করেন। এই নির্মম হত্যাকাÐে সমগ্র জাতি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শহীদ ময়েজউদ্দিনের আত্মদান ক্রমে ক্রমে গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধারের সংগ্রামকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছে দেয়। তাঁর রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে গড়ে উঠা প্রবল গণআন্দোলনে অবশেষে সামরিক শাসক ও শাসনের পতন ঘটে। গনতন্ত্রের জয় হয়। শহীদ ময়েজউদ্দিন একজন দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধেও সংগঠক, প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক, সমাজসেবী ও সাধারন জনকল্যাণে নিবেদিত প্রান মানুষ হিসেবে ইতিহাসে এবং মানুষের হৃদয়পটে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

মন্তব্য

মন্তব্য