রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা হতে ০২ (দুই) ভূয়া মেজরসহ প্রতারক চক্রের ০৮ (আট) জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-২।

 

১। র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। বিভিন্ন ধরণের চাঞ্চল্যকর অপরাধের স¦রূপ উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আনার কারনেই এই প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছে আস্থা ও নিরাপত্তার অন্য নাম হিসাবে গ্রহণ যোগ্যতা পেয়েছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে অপরাধীরা নিত্য নতুন অপরাধ করছে তার মধ্যে প্রতারণা অন্যতম। বিভিন্ন প্রতারক চক্র নানা কৌশলে সাধারন মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজিকরে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা ও সম্পত্তি। প্রতারক চক্র তাদের উদ্দেশ্য সফল ও মানুষের কাছে বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জনের জন্য বহুরূপী সাজে নিজেকে সাজিয়ে উপস্থাপন করে মানুষের সামনে। ইতিপূর্বে ভূয়া মেজর, ভূয়া ক্যাপ্টেন, ভূয়া ডিবি এবং পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার নাম ও পদবী ব্যবহার করে প্রতারণার জন্য বিভিন্ন প্রতারককে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে একটি প্রতারক চক্র বিভিন্ন অফিস, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ নানা জায়গায় চাকুরী দেয়ার জন্য একদিকে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয় এবং অন্যদিকে চাকুরী নিশ্চিত করার জন্য মেজর ও ক্যাপ্টেন পদমর্যদা ব্যবহার করে এমনভাবে সুপারিশ করে, তা জুনিয়র কিংবা অধঃস্তন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পক্ষে সে সুপারিশ মূল্যায়ন না করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়। অনেক সময় নিন্ম বা মধ্যম পর্যায়ের পদবী যাদের কাছে সুপারিশ করা হয় তাদের ঐ অফিসে কিংবা পদবী নামের সত্যতা যাচাই করার মত সময় কিংবা সুযোগ থাকে না।

২। র‌্যাবের কাছে বেশ কিছু জায়গা থেকে এই ধরনের প্রতারণার কিছু তথ্য আসার পর র‌্যাব-২ এর একটি দল বিষয়টি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮খ্রিঃ আনুমানিক ১৭.০০ ঘটিকার সময় শেরেবাংলা নগর থানাধীন বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের সামনে হতে ভূয়া মেজর পরিচয় দানকারী চক্রের অন্যতম হোতা ১। মোঃ জামাল (৩৪)কে আটক করা হয়। আটককৃত আসামী (জামাল) এর দেওয়া তথ্য মোতাবেক তার চক্রের অপর সদস্যদের ২। মোঃ সৈকত এ নীলয় (২৬), ৩। মোঃ সাজ্জাদ হক সৌরভ (২৪), ৪। নাজমুল আলম ভূইয়া (২৯), ৫। মোঃ মাসুদ মুন্সি (৩৫), ৬। শামীম আহম্মেদ (২৮), ৭। মাসুদ রানা (২৩), ৮। শাকিল আহম্মেদ (২৭)দেরকে আটক করা হয়। আটককৃত আসামীরা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র। তারা দীর্ঘদিন যাবৎ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফ্য¬াট ভাড়া নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার ভূয়া পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকুরী দেয়ার নামে প্রার্থীদের নিকট হতে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিত এবং পরবর্তীতে তাদেরকে চাকুরী না দিয়ে বিভিন্নভাবে প্রতারণা করে আসছিল। ধৃত আসামীদের’কে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

৩। মোঃ সৈকত এ নীলয় (২৬) এই চক্রের প্রধান হোতা, সে এই চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করতো। সে নিজেকে একজন সেনাবাহিনীতে কর্মরত মেজর হিসাবে পরিচয় দিত। বিভিন্ন মানুষের কাছে সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত অবস্থায় নিজেকে উপস্থপন করতো কর্মরত মেজর হিসাবে। তার অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষ বিশ্বাস করতো যে সে সেনাবাহিনীর একজন কর্মরত মেজর। সাধারন ছাত্র, বেকার যুবক, দরিদ্র ছাত্রদের সেনাবাহিনীতে চাকুরী দেওয়ার কথাবলে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিত। সে (সৈকত এ নীলয়) প্রাথমিকভাবে সেনাবাহিনীর একটি নিয়োগপত্র দেখাত এবং এতে নিজে একটি পদে চাকুরী দিতে পারবে বলে জানাতো। রাজি হলে একটি মোটা অংকের টাকা দাবি করতো। টাকা পরিশোধ হলে পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর ভূয়া নিয়োগপত্রে নিজের স্বাক্ষর বসিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে চাকুরী প্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে নিয়োগপত্র পাঠিয়ে দিত।

৪। মোঃ সাজ্জাদ হক সৌরভ (২৪) এই চক্রের ২য় হোতা, তিনি নিজেকে ডিজিএফআই এর অফিসারের পরিচয় দিত। সে ভূয়া চাকুরীপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভাল ভেরিফিকেশনের জন্য মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিত। সে (সাজ্জাদ হক সৌরভ) সৈকত এ নীলয় এর পরামর্শে ডিজিএফআই এর মনোগ্রাম ও সিল ব্যবহার করে চাকুরী প্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে ডাকে অথবা কুরিয়ারের মাধ্যমে ভেরিফিকেশনে সার্টিফিকেট প্রেরণ করতো।

৫। মোঃ জামাল (৩৪) তিনি একজন পেশায় ড্রাইভার। গাড়ী চালানোর পাশা পাশি এই চক্রের সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে পরে। তার কাজ ছিলো সাধারন মানুষদেরকে ফাঁদে ফেলে, সেনাবাহিনীর বড় কর্মকর্তা তাহার আত্মীয় ও আর্কষনীয় বেতনের কথা বলে মানুষদেরকে লোভে ফেলা। কখনও কখনও গাড়ী চালানোর পাশাপাশি খোস গল্পের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলতো। এই ভাবেই তিনি সাধারন ছাত্র, বেকার যুবক, দরিদ্র ছাত্রদের জোগার করতো। তার মূল কাজ ছিলো সাধারণ ছাত্র, বেকার যুবক, দরিদ্র ছাত্রদের এই প্রতিষ্ঠানে আনা এবং ভূয়া মেজর (সৈকত এ নীলয়) এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন পদে চাকুরী দেওয়ার প্রলোভন এবং ভূয়া নিয়োগপত্র দেখাত। তিনি(জামাল)এর মূল কাজ ছিল গ্রাম থেকে শহর মুখি ছাত্র, দারিদ্র ছাত্র, বেকার যুবকদের টার্গেট করে ভূয়া মেজর (সৈকত এ নীলয়) এর পর্যন্ত আনা।।

৬। নাজমুল আলম ভূইয়া (২৯) নিজেকে মেজরের পি,এস হিসেবে পরিচয় দিত। সে চাকুরীতে নিয়োগপাপ্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সকল প্রকার টাকা বিকাশে, কুরিয়ারের মাধ্যমে লেনদেন করতো। বেশি অংকের টাকা হলে আসামী (মাসুদ, শামীম, মাসুদ রানা ও শাকিল) দের সাথে নিয়ে যেত। তাদের গার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হত। তারা সকলেই সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের সক্রিয় সদস্য।

৭। ধৃত আসামীদের’কে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই বাছাই করে ভবিষ্যতেও র‌্যাব-২ এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখবে। উপরোক্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যাবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
৮। আসামীদের নাম ও ঠিকানা ঃ
ক) মোঃ সৈকত এ নীলয় (২৬), পিতা- আব্দুস সালাম, সাং- মহেশপুর, থানা- কাশিয়ানী, জেলা- গোপালগঞ্জ, বর্তমান- বাসা নং-৩৩, রোড নং- ০১, বøক-সি, রামপুরা, ঢাকা।
খ) মোঃ সাজ্জাদ হক সৌরভ (২৪), পিতা-মোঃ মোজাম্মেল হক, সাং-সাতপোয়া, থানা-সরিষাবাড়ী, জেলা- জামালপুর, বর্তমান- বাসা নং-০৭, রোড নং-২২, সেকশন-০৬, মিরপুর, ডিএমপি, ঢাকা।
গ) মোঃ জামাল (৩৪), পিতা- মোঃ শামসু উদ্দিন, সাং- পরানগঞ্জ, থানা- ভোলা, জেলা- ভোলা, বর্তমান- উত্তর তুলারবাগ, আনছার ক্যাম্প, মুন্সি আলীর বস্তি, দারুসালাম, ডিএমপি, ঢাকা।
ঘ) নাজমুল আলম ভূইয়া (২৯), পিতা-শাহ আলম ভূইয়া, গ্রাম-বাহেরচর, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা, বর্তমানে-মুক্ষী গিলর শেষ মাথায়, বিটিভির বিপরীত পার্শ্বে, রামপুরা, ডিএমপি, ঢাকা।
ঙ) মোঃ মাসুদ মুন্সি (৩৫), পিতা- আবু বক্কর মুন্সি, সাং- মুকসেদপুর, থানা- মুকসেদপুর, জেলা- গোপালগঞ্জ, বর্তমান- আলতাফ মিয়ার বাড়ী, হিমবাড়ী, জোয়ার সাহারা, থানা-বাটারা, ডিএমপি, ঢাকা।
চ) শামীম আহম্মেদ (২৮), পিতা-আবুল হোসেন, রোড নং-২০, বাড়ী নং-২১, নিউ সি বøক, থানা- শাহআলী, ঢাকা।
ছ) মাসুদ রানা (২৩), পিতা- মোঃ মাজেম আলী, সাং- কর্জনা, থানা-ঘিওর, জেলা- মানিকগঞ্জ, বর্তমান- বাসা নং-৬/১, রোড নং-১১, দক্ষিণ ভিশিল, মিরপুর-১, দারুসালাম, ডিএমপি, ঢাকা।
জ) শাকিল আহম্মেদ (২৭), পিতা- ওবায়দুল রহমান, সাং-নৌপাড়া, থানা-বাগাতীপাড়া, জেলা- নাটোর।

৯। উদ্ধারকৃত মালামাল ঃ
১) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাক -০২ (দুই) সেট।
২) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আইডি কার্ড – ০২ (দুই) টি।
৩) মোবাইল – ১১ (এগার) টি।
৪) সিমকার্ড – ১৫ (পনের) টি।
৫) প্রেনড্রাইভ – ০১ (এক) টি।
৬) পাওয়ার ব্যাংক – ০১ (এক) টি।
৭) নগদ টাকা – ১১,৪৪০/- (এগার হাজার চারশত চল্লিশ) টাকা।

মন্তব্য

মন্তব্য