পঞ্চগড় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঝাড়ুদার শকুন

মুহম্মদ তরিকুল ইসলাম, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধিঃ পঞ্চগড় অঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক ঝাড়ুদার পরিচ্ছন্নকর্মী হিসাবে পরিচিত পরিবেশ রক্ষাকারী শকুন পাখি। যার ইংরেজী নাম ঠঁষঃঁৎব। দেশীয় প্রজাতির শকুনের বৈজ্ঞানিক নাম জেপস বেঙ্গালেনসিস (এুঢ়ং নবহমধষবহংরং)। ইংরেজী নাম ডযরঃব-ৎঁসঢ়বফ াঁষঃঁৎব। গলা লম্বা, লোমহীন মাথা ও গলা গাঢ় ধূসর। পশ্চাদেশের পালক সাদা। পা কালো। ডানা, পিঠ ও লেজ কালচে বাদামি। একই বাসা ঠিকঠাক করে বছরের পর বছর ব্যবহার করে। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তাদের প্রজননকাল। ৪৫-৫০ দিনে ডিম ফোটে। তী² দৃষ্টির অধিকারী এটি একটি শিকারী পাখি। সাধারণত লোকচক্ষুর আড়ালে বট, পাকুড়, জামরুল, ডুমুরসহ দেশীয় প্রজাতির প্রভূতি বিশালাকার গাছে এরা বাসা বাঁধে। গুহায়, গাছের কোটরে বা পর্বতের চুড়ায় এটি ডিম পাড়ে। শকুনরা দল বেধে এসে মৃত প্রাণীর চারপাশ ঘিরে রাখতো। প্রধান শকুন ডানা মেলে অনুমতি দিলে মুহূর্তেই শেষ করে ফেলতো প্রাণীর নিথর দেহ। পৃথিবীতে ২৩ প্রজাতির শকুন রয়েছে। বাংলাদেশে শুধুমাত্র ৬ প্রজাতির শকুনের মধ্যে বাংলা শকুনটি-ই কোনমতে টিকে আছে।
পঞ্চগড় অঞ্চলের লোকালয়ে একসময় প্রচুর শকুন দেখা মিললেও কালের বিবর্তনে শকুন আজ বিপন্ন প্রায়। অন্যদিকে শকুন যেহেতু মরা পশুর গোশত খায়, তাই শকুন সবসময় অন্য পশুর মৃত্যু কামনা করে থাকে। তাই লোকবিশ্বাস অনুযায়ী শকুনকে অমঙ্গল প্রাণী আখ্যায়িত করতেন সাধারণ মানুষ। গ্রাম অঞ্চলে কারো বাড়ির ওপর দিয়ে যদি শকুন উড়ে যায়, তাহলে তা অমঙ্গলের আভাস বলেই ধরে নেয়া হতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, শকুন অশুভ তো নয়ই, হিং¯্রও নয়। শকুন পরিবেশের পরম বন্ধু। মৃত পশু খেয়ে শকুন আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
কিন্তু হতাশার কথা, বিগত ৩ দশকে বাংলাদেশে প্রায় ৯৯ ভাগ শকুন মারা গেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগেও বাংলাদেশে প্রায় ৫০,০০০ এর চেয়ে বেশি শকুন ছিল। এখন হাতে গোনা ৫০০ শকুনও নেই। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ অব ভেটেরিনারি মেডিসিন-এর গবেষক ড. লিন্ডসে ওক তার এক গবেষণায় প্রমাণ করেন, গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার, শকুন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ওই গবেষণায় তিনি উল্লেখ করেন, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম (ডাইক্লোফেন) ওষুধ ব্যবহার করা গরু ও ছাগলের মৃতদেহ ভক্ষণ করলে কিডনি নষ্ট হয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শকুন মারা যায়। ফলে ভারত ও পাকিস্থান ২০০৬ সালে, নেপাল ২০০৯ সালে ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম (ডাইক্লোফেন) বন্ধ করে পরিবর্তে মেলোক্সিম্যাসহ বিকল্প ওষুধ ব্যবহার শুরু করে। বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে গবাদিপশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এতে ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম নিষিদ্ধে বন্ধ থাকলেও কিটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ পশু চিকিৎসকের কাছে সচরাচর ব্যবহার হচ্ছে বলে জানান এক পশু চিকিৎসক। তবে কোথাও কোথাও এখনও ব্যবহার হয় নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম জাতীয় ওষুধ। অন্যদিকে আবাসস্থল, খাদ্য সংকট ও সচেতনতা সৃষ্টির অভাবে এবং নিষিদ্ধ ওষুধ- এর কারণে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী এ প্রানীটির আজ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ কয়েক দশক পূর্বেও পঞ্চগড় অঞ্চলের প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি এলাকায় শকুনের দেখা মিলত।
বন বিভাগের তথ্য মতে, সারা পৃথিবীতে ২৩ প্রজাতির শকুন রয়েছে। দেশে এক সময় ৬ প্রজাতির শকুনের দেখা মিললেও এর ৩ প্রজাতি স্থায়ীভাবে বসবাস করত। আমাদের দেশীয় প্রজাতির শকুনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, রাজ শকুন, সাদা গিদরী বা গিন্নী শকুন, লম্বা ঠোঁট শকুন আর ভ্রমণকারী হিসেবে কালো শকুন আর গ্রিফন শকুন ছিল। এর মধ্যে বাংলা ও সরুঠোঁট প্রজাতির শকুন প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকলেও বিলুপ্ত হয়ে গেছে স্থায়ীভাবে বসবাস করা রাজশকুন। শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখ আর্ন্তজাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালিত হয়ে থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থা (আইইউসিএন, বন বিভাগ, বাংলাদেশ বন্য প্রাণী ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ বার্ডস ক্লাব) শকুন সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পঞ্চগড়ে এখনও কিছু শকুন চোখে পড়ে যা সংরক্ষণের উদ্যোক্তা নেই। তবে বাংলাদেশের কিছু কিছু অঞ্চলে এখনও যে কিছু সংখ্যক শকুন বঁেচে আছে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমাদের রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়েও এ ধরণের উদ্যোক্তা নেয়া উচিত বলে মনে করেন পঞ্চগড়ের সর্বসাধারন। আগে মৃত প্রাণী পড়ে থাকলে শকুনে ভরে উঠত চারপাশ। এখন ৫-৬টি শকুন একসাথে দেখা প্রায় যা অবিশ্বাস্য। খুব দ্রæত শকুন সংরক্ষণে যদি জোরালো উদ্যোগ না নেয়া হয় তবে অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই মহাউপকারী শকুন।
বিজ্ঞানীদের অভিমত সূত্র জনায়, শকুন না থাকার কারণে বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স, যক্ষা, ক্ষুরা রোগ ইত্যাদি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার এবং জলাত্মঙ্ক রোগ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার ৬নং সাতমেড়া ইউপির লই পাড়া গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন জানান, আমার বাড়িতে প্রায় সব কয়টি গরুর ক্ষুরা রোগ হয়েছে। শকুন না থাকায় গবাধি পশুর মৃত দেহ এখন শিয়াল, কুকুর, ইঁদুর, কাক, চিলসহ অন্যান্য স্থন্যপায়ী প্রাণী খাচ্ছে। এদের পেটে রোগ জীবানু নষ্ট না হওয়ায় জংগল ও জনপদে পড়ছে এসব মারাত্মক ব্যাধি। স¤প্রতি সময়ে বাংলাদেশেও শকুন নিয়ে সচেতনতা ও গবেষণাধর্মী কাজকর্মের ফলে পূর্বের অবস্থা থেকে কিছুটাও উন্নতি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মন্তব্য

মন্তব্য