শ্রীপুরে অননুমোদিত সীসা ও ব্যাটারী কারখানা বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন !

সাইফুল আলম সুমন,নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
গত তিন বছর যাবত শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অননুমোদিত এবং ভাড়া জায়গায় সীসা ও ব্যাটারী উৎপাদন হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে গবাদি পশু মড়ক ও মারাত্মক পরিবেশ দুষণের এর প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার দুপুর ১২টায় শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পূর্ব খন্ড সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ও বৃহষ্পতিবার বিকেলে উত্তর পেলাইদ চৌরাস্তায় এ কর্মসুচী পালিত হয়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ অংশগ্রহন করেন। শ্রীপুর পৌর শহরের কেওয়া পূর্ব খন্ড সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তেলিহাটী ইউনিয়নের উত্তর পেলাইদ এলাকায় দুটি মানবপ্রাচীর তৈরী করা হয়।

সীসা ও ব্যাটারী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কারণে গবাদি পশুর মড়ক, আবাদি জমি নষ্ট ও স্থানীয়দের শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা সহ নানারকম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। শ্রীপুরের কেওয়া পূর্ব খন্ড সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শ্বাসসকষ্টসহ নানা রোগের শিকার হয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে। এলাকাবাসী ও জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, কারখানাগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। তবে থানা পুলিশের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মাসোহারা দিয়ে তারা উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন।
কেওয়া গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শ্রীপুরের কেওয়া পূর্ব খন্ড এলাকার গেলি (এবষর) ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানী লিমিটেডের আশপাশের আবাদি জমিতে এখন আর ফসল হচ্ছে না। স্থানীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক খলিলুর রহমানসহ তার অন্য সহকর্মীরা জানান, শিশু, শিক্ষককেরা দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে পারছেন না। ঝাঁঝালো গন্ধে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা, চেহারা জীর্ণ শীর্ণ হওয়াসহ নানা ধরণের রোগ ব্যাধিতে শিশু ও সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয় অধিবাসী অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, বার বার মানববন্ধন, প্রতিবাদ করেও কোনো ফল পাচ্ছি না। আগামীতে কারখানা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব। শ্রীপুর গণজাগরণ মঞ্চের সমন্বয়কারী আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে কারখানার আশপাশের সকল রাস্তাঘাট বন্ধ করে ননস্টপ আন্দোলন হবে ।

সরেজমিন উত্তর পেলাইদ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কারখানাগুলোর আশপাশে পরিচিতিমূলক কোনো সাইনবোর্ড নেই। ভাড়া করা জায়গায় ভেতরে গর্ত করে আগুন ধরিয়ে সেখানে পুরনো ব্যাটারী পোড়ানো হয়। আগুনে পুড়ে ব্যাটারী থেকে গলিত সীসা বের হচ্ছে। ওই গলিত মন্ড থেকে প্লেট আকারে তৈরী করে সেগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সংরক্ষিত সীসাগুলো দিয়ে আবার ব্যাটারী তৈরী করা হচ্ছে। এগুলোর বর্জ্য আবাদি জমি ও উম্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে। কারখানাগুলোর শ্রমিকেরা জানান, প্রতিনিয়ত ঝাঁঝালো গন্ধ আর দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম নিয়ে জীবিকার তাগিদে তারা কাজ করছেন। বর্তমানে বেঁচে থাকা ভবিষ্যত জীবন ঝুঁকির কাছে অর্থহীন। উত্তর পেলাইদ এলাকার দোখলা ব্রিজের দুই পাশে দুটি ও সিসিডিবি সড়কের পাশে একটি কারখানা রয়েছে। উত্তর পেলাইদ এলাকার কৃষক মাজহারুল হক বলেন, ব্যাটারী কারখানার আশপাশের পতিত জমিতে গরু ঘাস খাওয়াতে গেলে তিন মাসে একটি ও ৬ মাস আগে তার দুটি গরু মারা গেছে। বিধবা হোসনা বেগম বলেন, গত চার মাস আগে ব্যাটারী কারখানার আশপাশে গরুর ঘাস খাওয়াতে গেলে দুই মাসের ব্যবধানে তার তিনটি গরু মারা যায়। কৃষক আক্কাস আলী জানান, একটি ষাঁড় ও একটি গাভী গত এক বছর আগে ব্যাটারী কারখানার গ্যাসের প্রভাবে মারা যায়।

কৃষক হারুন অর রশীদ জানান, গত আট মাস আগে সীসা কারখানার কাছে দোখলা ব্রিজের পানি ও খাল পাড়ের পানি খেয়ে তার দুটি গরু মারা যায়। কৃষক শহীদ জানান, তার একটি গরু গত পাঁচ মাস আগে মারা যায়। কৃষক মোন্তাজ উদ্দিন বলেন, উপায়ন্তর না দেখে আমরা আজ মানববন্ধন করতে বাধ্য হয়েছি। উত্তর পেলাইদ এলাকার এক কারখানায় গিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বাবু মিয়া নামে একজন কারখানাটি পরিচালনা করছেন। জাকির হোসেন নামে তার এক কর্মচারী জানান, কর্তৃপক্ষ থানার অনুমতি নিয়ে ভাড়া জমিতে কারখানা চালাচ্ছেন। কারখানা পরিচালনার জন্য নিয়মিত থানায় মাসোহারা দেয়া হচ্ছে। তেলিহাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন সরকার সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ অনেক দিন থেকে পেয়ে আসছি। এ ব্যাপারে কারখানা মালিকদের নিষেধ করা সত্তে¡ও রাতের আঁধারে ব্যাটারী পুড়িয়ে সীসা সংগ্রহ করছে। এতে কয়েক বছর যাবত ওই এলাকায় গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগীর মড়ক দেখা দিয়েছে। এদেরকে সমূলে উচ্ছেদ করা দরকার। এ কারখানার কারণে ভবিষ্যতে ওই এলাকায় বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হবে। এসব বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল জলিল সাংবাদিকদের বলেন, এ অভিযোগ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া গেছে। উপজেলার গাজীপুর, গোসিঙ্গা, পটকা, বেড়াবাড়ী এলাকাতেও সীসা উৎপাদন ও ব্যাটারী পোড়ানোর কারখানা গড়ে উঠেছিল। পরে ওইসব কারখানার আশপাশে গবাদি পশুর মড়ক শুরু হয়। এরপর এলাকাবাসীর চাপের মুখে কোনো কোনো কারখানা মালিক কৃষকদেরকে জরিমানা পরিশোধ কারখানা বন্ধ করে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। কারখানা বন্ধ করে দেয়ার পর গবাদি পশুর মড়ক আর দেখা যায়নি।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, থানা থেকে কারখানার পরিবেশের কোনো অনুমোদন দেয়া হয় না। মাসোহারাও নেয়া হয় না। এ বিষয়টি আমার নলেজে ছিল না। আমি দ্রæত ব্যবস্থা নেব। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. দেওয়ান হুমায়ুন কবীর সাংবাদিকদের বলেন, সীসা কারখানার বিষয়টি আমার নলেজে রয়েছে। এগুলো আমরা ভেঙ্গে ফেলব।

মন্তব্য

মন্তব্য