আনিছুর রহমান স্যারের প্রয়াণ: একটি নক্ষত্রের বিদায়

হালিম সৈকত,কুমিল্লা//আনিছুর রহমান স্যার। মাছিমপুর আর আর ইনস্টিটিউশনের একজন তুমুল জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। এই স্কুলে চাকরি করেছেন সহকারি শিক্ষক হিসেবে সুদীর্ঘ ২৯ বছর সততার সাথে। সেই ১৯৮১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত। বর্নাঢ্য এই শিক্ষকতা জীবনে হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে তিনি মানুষ করেছেন সযতেœ। তিনি খুব কঠিন বিষয়টাকে হাস্য-রসাত্মক ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করতেন যা সকলেই খুব সহজে বুঝতে সক্ষম হত।
তিনি মূলত ছিলেন বাংলার শিক্ষক কিন্তু পড়াতেন ইংরেজি। এটা কিভাবে সম্ভব! অবশ্যই সম্ভব। কারণ তখন ইংরেজির কোন শিক্ষক ছিল না (অবশ্য এখনও নেই)। স্যার এক্সটা ক্লাস নিতে নিতে এত পরিপক্ব হয়ে ওঠলেন যে পরবর্তীতে কোন ইংরেজির শিক্ষক তাঁর সাথে পেরে ওঠেননি। ইংরেজি ভাষাটাকে এমনভাবে রপ্ত করেছিলেন যে বাংলা ভাষার চেয়েও অধিক দক্ষতার ছাপ রেখেছিলেন ইংরেজিতে। অবশ্য বাংলাও মাঝে মাঝে পড়াতেন। বিশেষ করে জহির রায়হানের উপন্যাস হাজার বছর ধরে। এত চমৎকার উপস্থাপন আমি তখন পর্যন্ত কোথাও দেখতে পাইনি। পরে জানতে পারি স্যার মঞ্চ নাটক করতেন। মঞ্চে যারা কাজ করেন তারা প্রায় সবই পারেন। জুতা সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ পর্যন্ত সবই তাদের ধারণার মধ্যে থাকে। স্যারও ছিলেন তেমনি। মনে আছে তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। তখন আমি সাজ্জাত, শাহজালাল আর সুকেন সব প্রোগ্রামের দায়িত্ব নিতাম এমন কি প্রতিদিন শপথ বাক্য পাঠ এবং জাতীয় সংগীতের ভার আমাদের উপরই বর্তা তো। তখন ২১শে ফেব্রæয়ারির দিন আমরা ঠিক করলাম নাটক করব অথচ নাটকের ন টাও বুঝি না। নাটক করতে পারি এমন ভাব দেখালাম যে মহা পন্ডিত। আসলে হাদারাম। স্যার ডেকে নিয়ে স্ক্রিপ্ট তৈরি করে দিলেন আমার চরিত্রের নাম ছিল রফিক (ভাষা সৈনিক)। ঢাকা শহরে মিছিল করতে গিয়ে পাকিস্তানীদের গুলিতে রফিক মারা যায়। স্যারের নির্দেশনায় চমৎকার হয়েছিল নাটকটি। সকলে বেশ হাততালি দিয়েছিলেন।
পরে জানতে পেরেছি স্যার চলচ্চিত্র অভিনেত্রী আনোয়ারার সাথে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এছাড়া কুমিল্লার আরেক প্রয়াত সু-অভিনেতা গেদু ভাইয়ের সাথে এক সঙ্গে কাজ করেছেন। সেই উৎসাহেই পরবর্তীতে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় মঞ্চ নাটকের সাথে জড়িয়ে পড়ি নন্দিত অভিনেতা মঞ্চপুরুষ শাহজাহান চৌধুরীর সাথে প্রতিবিম্ব থিয়েটারের সঙ্গ। এখনও চলছে। স্যার নবম-দশম শ্রেণির জীব বিজ্ঞানও পড়াতেন। এত চমৎকারভাবে পড়াতেন আমি অবাক হয়ে যেতাম। একজন প্রফেশনাল চিত্রকরের মত তিনি জীবকোষ, প্রাণীকোষ এবং ফুসফুসের ছবি আঁকতেন।
একদিন উপন্যাস পড়াচ্ছিলেন হাজার বছর ধরে। টুনি আর মন্তুর প্রসঙ্গ এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুললেন যে, আমাদের সামনে ভেসে উঠল সেই চিত্র। আমি স্যারকে প্রশ্ন করলাম, স্যার কিভাবে লেখা লিখতে পারি? স্যার বললেন, শুরু করাটাই হচ্ছে আসল। শুরু করলে হয়ে যাবে। স্যার একটা উদাহরণ দিলেন। এমন হতে পারে। আমি একদিন এক বাসায় গেলাম ড্রয়িং রুমে বসে গল্প করছি। এমন সময় একটি সুন্দরী মেয়ে দরজায় ঢুকে আমাকে দেখে সলজ্জ চোখে চোখ রেখে চোখ কপালে তুলে জিব কেটে বেরিয়ে গেল। চুলগুলো তার কোমরে পরছে। দেখে আমি খেই হারিয়ে ফেলার মত অবস্থা। এভাবে শুরু করতে পারিস। এত সুন্দর করে কিভাবে স্যার পারেন।
অন্য আরেক দিনের ঘটনা। আমি একদিন স্যারের ভর্ৎসায় রাগ করে সিলেট চলে যাবার জন্য দরখাস্ত লিখলাম। ১৫ দিনের ছুটি চাইলাম। স্যার অনেক বুঝালেন। অবশেষে ছুটি মঞ্জুর না হলেও চলে গেলাম। স্যার আমাকে একটি চিরকুট চিঠি লিখেছিলেন। আমি মহাখুশি হয়েছিলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল ঐ চিঠি। আজও সযত্বে রেখেছি ঐ চিঠিখানা।
আজকে ফ্রেন্ডস ক্লাবের যে তুমুল জনপ্রিয়তা। শুরুতেই ছিলেন শ্রদ্ধাভাজন আনিছ স্যার। আমাদেরকে দিক নির্দেশামূলক সকল ধরনের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। স্যার যখন স্কুল থেকে বিদায় নেন, শুনেছিলাম স্যারের বিদায়টা ছিল কিছুটা নিভৃত্বে। যেটা আমরা চাই নি। স্যারের সাথে মোবাইলে মাঝে মাঝে কথা হত। কল দিলে স্যার খুব খুশি হতেন। বলতেন আমাকে তোরা মনে রেখেছিস। কথায় কথায় স্যারকে বললাম স্যার একদিন আসেন না মাছিমপুরে। স্যার বললেন না। আর কখনো যাব না তোদের ওখানে। কি সেই অভিমান? পরে সব জেনেছিলাম। অবশেষে স্যারকে রাজি করিয়ে নিয়ে আসলাম। সংবর্ধনা দিলাম মাছিমপুর হাইস্কুলে। সত্যি বলতে কি স্যার এত খুশি হয়েছিলেন, বলার মত নয়। স্যার বলেছিলেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া এই সম্মাননা। আর একটি কথা বলেছিলেন তোদের মাঝে আমাকে বাঁচিয়ে রাখিস।
একটি দুঃখবোধ হয়ত থাকবে। আমরা ক্লাবের একটি ম্যাগাজিন বের করার কথা ছিল। যা এখনও করতে পারিনি। স্যার একটি লিখা দিয়েছিলেন। রম্য লেখা- রসগোল্লা শিরোনামে।
এই রকম হাজারও ঘটনা রয়েছে স্যারকে ঘিরে। যা বলে শেষ করা যাবে না। অবশেষে বলতে চাই। স্যার থাকবেন আমাদের হৃদয়ের মনিকোঠায়। পরপারে ভাল থাকবেন স্যার। আপনার চলে যাওয়া কোনভাবেই মানতে পারছেন না আপনার হাজারও ছাত্র-ছাত্রী। বড় অসময়ে চলে গেলেন আপনি।

মন্তব্য

মন্তব্য