ঝিনুকের চুন খাওয়া কি জায়েজ

পানের সঙ্গে চুন না হলে যেন পান খাওয়াই সার্থক হয় না। ফলে যাদের পান খাওয়ার অভ্যাস আছে, তারা বিভিন্ন রকম চুন খেয়ে থাকে। যার মধ্যে ঝিনুকের চুন অন্যতম। প্রশ্ন জাগতে পারে, এ ধরনের চুন খাওয়া কি জায়েজ? কারণ বিভিন্ন ফতোয়ার কিতাবে ঝিনুক খাওয়াকে নাজায়েজ বলা হয়েছে। আজকের লেখায় এ বিষয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

চুন সাধারণত পাথর ও শামুক-ঝিনুক থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু পাথুরে চুন প্রক্রিয়াকরণে রাসায়নিক দ্রব্য এবং এসিডের পরিমাণ বেশি থাকায় এটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালসিয়ামের ক্ষয় হয়, দাঁতের ক্ষয় হয়, পাকস্থলীতে সমস্যা করে, কেননা এই চুন বেশির ভাগই ব্যবহৃত হয় বসতবাড়িতে চুনকাম করার জন্য। তবে প্রাচীন পদ্ধতিতে শামুক-ঝিনুক থেকে তৈরি করা চুন কেমিক্যালমুক্ত ও শরীরের জন্য ভালো হওয়ায় এর চাহিদা বেশি।

শামুক-ঝিনুক থেকে চুন তৈরি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের বহু পরিবার। কেউ কেউ বংশপরম্পরায় যুগ যুগ ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চুন ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় দিনাজপুর সদর উপজেলার চুন ব্যবসায়ীদের নামেই চুনিয়াপাড়া নামে একটি এলাকা রয়েছে।

শামুক-ঝিনুক থেকে চুন প্রস্তুত প্রণালী

শামুক-ঝিনুকের খোলস পুড়িয়ে এই চুন তৈরি করা হয়। প্রথমে শামুক-ঝিনুকের খোসা রোদে শুকানো হয়। এরপর মাটির তৈরি চুলার তলদেশে বিছানো হয় ইট। পরে ইটের ওপরে বিছানো হয় মাটির ভাঙা হাঁড়ির টুকরা। ছোট ছোট কাঠের টুকরা ব্যবহার করা হয় আগুন ধরানোর জন্য। এরপর ঝুড়ি ভরে শামুক ফেলা হয়। এরপর আবার এক স্তরে ছোট ছোট কাঠের টুকরা রাখা হয়। পরে আবার শামুক ফেলা হয়। এভাবে চুলাটা পুরো ভরে ফেলে আগুন দেওয়া হয়। আগুনের ধোঁয়া কাঠের স্তরে স্তরে ছড়িয়ে পড়ে; আর ধোঁয়া সরবরাহ করার জন্য চুলার নিচে এক পাশে ফাঁকা অংশ থাকে, সেখান থেকে বাতাস দিয়ে ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এভাবে ২০-২৫ মিনিট করার পরই শামুক-ঝিনুক নামিয়ে ফেলা হয়। আসলে এখানে ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে আগুনের তাপে ক্যালসিয়াম অক্সাইড বা কুইকলাইম তৈরি করা হয়। পরে এই ক্যালসিয়াম অক্সাইড বা কুইকলাইম চূর্ণ করে চালুনি দিয়ে ছেঁকে একটা মাটির গর্তে রাখা হয়। মাটির গর্ত লেপা থাকে। পরে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে দুই-তিন ঘণ্টা বাঁশের হাতা দিয়ে নাড়লেই সাদা ধবধবে প্রাকৃতিক চুন পাওয়া যায়। সাদা আরো বেশি করার জন্য বিচি কলার রস দেওয়া হয় এই চুনে। এরপর চুনগুলো নেটের কাপড় দিয়ে ছেঁকে একটা পাত্রে রাখা হয়। পরে প্যাকেটজাত করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়।

বোঝা যাচ্ছে, ঝিনুক ইত্যাদি থেকে চুন তৈরি করার পর তার ‘হাকিকত’ মৌলিকত্ব পরিবর্তন হয়ে যায়। ফলে তা পানের সঙ্গে সামান্য পরিমাণ খাওয়া জায়েজ। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া : ৫/২০১, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ১১/৩৭৬)

তবে যদি এমন হয়, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হবে, তবে তা মাকরুহ হবে। (হিন্দিয়া : ৫/৩৪১, নফউল মুফতি ওয়াস সাইল, পৃষ্ঠা : ৯৩)

মন্তব্য

মন্তব্য