ফ্যাসিজম সাগরে ডুবছে দেশ


মো.আখতার হোসেন আজাদ

নানা মুনী, নানা মত; যত মত তত পথ। বাক্যগুলোর সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। নানা মতের মানুষের বদৌলতে পৃথিবীতে আবির্ভাব হয়েছে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও আদর্শের। মন ও চিন্তার ভিন্নতার জন্য তৈরি হয়েছে নানা মতবাদের, যার ইংরেজিতে ইজম ( ism) নামে পরিচিত। আধুনিক বিশ্বে নানা মতবাদের সাথে আরেকটি নতুন ইজম বা মতবাদের আবির্ভাব ঘটেছে; যার নাম ফ্যাসিজম। বাস্তবিক অর্থে প্রত্যেকটি ইজমের ভালো-মন্দ দিক রয়েছে যার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণের জন্য মানুষ বাগযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত নানা মতবাদে বিশ্বাসী বলে মানুষ পরিচয় দিলেও ফ্যাসিজমী হিসেবে কেউ নিজেকে ভাবতেও চায় না। অথচ পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষ ফ্যাসিজমবাদী আচরণ করে থাকে। বাংলাদেশেও এর ঢেউ আঁছড়ে পড়েছে বহু আগে। আর বর্তমানে এটি বিকশিত হয়ে অপেক্ষায় রয়েছে বিষ্ফোরণের।
বইয়ের ভাষায় ফ্যাসিজমের অর্থগত বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। আমি সেদিকে যাব না। সাধারণ মানুষের মনের ভেতরে সহজভাবে যে কথাগুলো গেঁথে দেওয়া যাবে সেগুলোই লেখার চেষ্টা করব।
ইতালিয়ান ভাষায় ফ্যাসিজম ( fascism ) শব্দটির উৎপত্তি ফ্যাসিও ( fascio) থেকে। ফ্যাসিজম বলতে মূলত একনায়কতন্ত্র বা একগুঁয়েমিতাকে বোঝানো হয়। পূর্বে রাষ্ট্র বা সরকারকেই কেবল ফ্যাসিজমী বলে আখ্যায়িত করা হলেও দিন বদলের সাথে সাথে এর প্রকারভেদ বিস্তৃতি হয়েছে। আমার কথা ঠিক, আমি যা ভাবি, যা করি, যা বিশ্বাস করি কেবলমাত্র তা-ই ঠিক। অন্যরা যা করে, অন্যরা যা বলে বা বিশ্বাস করে সবই ভুল। আমার চিন্তা ও কর্মরাজ্যে আমিই সেরা, আমিই প্রভু এটিকেই মূলত ফ্যাসিজম বলা হয়। এটি মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয়। চিন্তাশক্তিকে কূপমন্ডুক করে তোলে। আমরা রাষ্ট্র বা সরকারের চিন্তা একপাশে রেখে যদি ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনের দিকে লক্ষ্য করি, তবে ফ্যাসিজমের ভয়াবহ রূপ সহজেই চোখে পড়বে।
কর্তৃত্ব বিস্তার করা বা অন্যের প্রতি নিজ প্রভাব সৃষ্টি করা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। এটিকে যারা দমন করতে পারে, তারা পৃথিবীর ইতিহাসে নিজের নামকে সোনালী অক্ষরে লিখে যেতে সক্ষম হন। অন্যরা চরমপন্থা অবলম্বন করে কিছু সময়ের জন্য নিজের সুনামের সুগন্ধ ছড়িয়ে দিতে পারলেও পরে তার সুবাস দ্রæতই হারিয়ে যায়।
পিতামাতার ¯েœহ মমতায় আমরা বেড়ে উঠি। ব্যক্তিজীবনে ফ্যাসিজমের বিকাশ ঘটতে শুরু বাল্যকাল থেকেই। স্বাভাবিকভাবেই ছোটবেলায় পাড়ার বন্ধুর সাথে বা স্কুলের সহপাঠীর সাথে ঝগড়া হয়। প্রকৃত কারণ না জেনেই অভিভাবকেরা নিজেদের সন্তানকে নিদোর্ষ বুলি ছুঁড়ে দেন। এভাবে সন্তানের বিবেকে অপরাধবোধের উদয় হওয়া গুণটিকে ধ্বংস করা হয়।
এবার নজর দেওয়া যাক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দেশ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের থেকে মূলত সকলের প্রত্যাশা থাকে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষালাভের। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষকদের আচরণ বড়ই আশঙ্কাজনক হয়ে আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। রাজনীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দখলের লড়াই তাদের প্রধান নীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। নিজেদের হীন স্বার্থের জন্য সহকর্মীকে প্রতিপক্ষ ভেবে অপদস্থ করতে সর্বপ্রচেষ্টা করে থাকেন। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার ফলে বিভিন্ন গ্রæপ ও প্যানেলে বিভক্ত হয়ে কেবলমাত্র নিজেদের দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদ দাবী করে অন্যদের হেয় করা যেন তাদের মূল দায়িত্ব!
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরে আসি ছাত্র রাজনীতিতে। ছাত্রসমাজের বিভিন্ন নায্য দাবী আদায়ে ছাত্র রাজনীতির প্রচলন হলেও বর্তমানে তার লাইনচুত্যি ঘটেছে। আমার দল সেরা, আমার আদর্শ সঠিক, শুধু আমিই ঠিক। এমন ভ্রান্ত বিশ্বাস ও নীতি চর্চার ফলে বর্তমান ছাত্র রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়েছে। ভিন্নমত সহ্যের ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। ছাত্র রাজনীতিতে ফ্যাসিজমের ফলে আমাদের দেখতে হয়েছে আবরার হত্যার মতো করুণ মর্মান্তিক দৃশ্য। পরমত সহিষ্ণুতা চর্চা যদি ছাত্র রাজনীতিতে ফিরে না আসে তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে আরো লাশের কফিনের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আমাদের দেশের বৃহত্তর রাজনীতিতে আরো ভয়াবহ অবস্থা। রাজনৈতিক দলসমূহের একে অপরের প্রতি ঘৃণা ও অবিশ্বাসের ফলে বাংলাদেশে চরমাকারে রাজনৈতিক সংকট বিরাজমান রয়েছে। রাজনীতিতে এই ফ্যাসিজম চর্চা সকলকে অন্ধ করে দিয়েছে। সরকারি দল নিজেদের কোন ব্যর্থতা বা দূর্বলতা খুঁজে পায় না, তাদের নেতা-কর্মীরা নিজ দল বা নেতার কোন ক্রুটি দেখতে পান না। বিপরীতে বিরোধী দল বা সরকারের বাইরে থাকা দলসমূহ সরকারের কোন উন্নয়ন কর্মকান্ড দেখতে পায় না। এভাবে বিদ্বেষমূলক প্রতিহিংসার রাজনীতি অবিরত চর্চার ফলে সমালোচনা কোন পক্ষই সহ্য করতে পারে না। সে ভালো, তুমি ভালো; আমি আরো ভালো হতে চাই এমন রাজনীতি চর্চার বদৌলতে যদি এমনাবস্থা চলমান থাকে, তবে সমাজে সহিংসতার মাত্রা চরমাকার ধারণ করবে।
এবার নজর দেওয়া যাক ধর্মীয় দিকে। ওয়াজ মাহফিলে বক্তারা নিজেকে বা নিজের মতাদর্শ লালন করা ওয়াজেনবৃন্দকে একমাত্র সঠিক পথ অবলম্বনকারী ভেবে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়ে সামাজিক পরিবেশ নষ্ট করছেন। ধর্মীয় রাজনীতি, ধর্মের নামে রাজনীতি, সহীহ হাদীস, আহলে হাদীস, বিভিন্ন মাজহাব, ইসলামী আন্দোলন, দ্বীনি আন্দোলন, পীর-সূফী-মাজার পন্থীসহ শত শত দল বা গ্রæপে ভাগ হয়ে নিজেদের একমাত্র সঠিক পথ অবলম্বনকারী দাবীতে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভেদের সৃষ্টি করছেন।
বর্তমান বাংলাদেশে ধর্ম, রাজনীতি, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের পর্যায়ে আনয়ন এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরোধী ভেবে দমন-পীড়নের মনোভাব ধারণ করে চলেছে। নিজেকে প্রমাণ করার জন্য প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা ব্যতীত আর কোন পথ নেই এমন চর্চা পুরোদমে চালু হয়েছে। এমন অবস্থা যদি চলমান থাকে, কয়েক দশকের মধ্যে দেশের আইনের শাসন কেবলমাত্র দলিল-দস্তাবেজের মাধ্যমেই জীবিত থাকবে। সমাজে সৃষ্টি হবে মৎসন্যায় অবস্থা। সবলেরা সবসময় অপেক্ষাকৃত দূর্বলকে বিভিন্নভাবে হয়রানি আর দমনের চেষ্টা করবে। দূর্বলেরা বেঁচে থাকার তাড়নায় সর্বোচ্চ সহিংস পথ বেছে নিবে। দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে, সার্বভৌমত্বের স্বার্থে প্রত্যেকের মন থেকে, নীতি থেকে এই ফ্যাসিজমী আদর্শ মুছে ফেলতে হবে। নতুবা অরাজক পরিস্থিতিতে দেশ যাবে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে।

লেখক:
শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মন্তব্য

মন্তব্য