করোনা দুর্যোগে মানবিক পুলিশ

বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ পুলিশের নিকট হতে সারা বছরই ইতিবাচক পুলিশিং এর প্রত্যাশা করে থাকে। জনগণের প্রত্যাশা আমাদের দেশে পুলিশিং ব্যবস্থায় এমন কালচার তৈরি করা হবে যেখানে প্রত্যেক সদস্য আধুনিক ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় জনমুখী পুলিশিং এর চর্চা করবে এবং ফলশ্রুতিতে সেখানে জবাবদিহীতা, দায়বদ্ধতা, পদায়ন ও নিয়োগ বাণিজ্য রহিতকরণ, অন্যদের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধকরণ, ঘুষের প্রচলন বন্ধ করা, যথাযথ প্রক্রিয়ায় সর্বস্তরের পুলিশ সদস্যদের পদন্নতি নিশ্চিত করা, প্ররোচনায় নির্দোষীকে অভিযুক্ত হিসেবে সাব্যস্ত করা রদকল্পে যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণই বাংলাদেশের পুলিশের মর্যাদা ও সেবার মানকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। বিশ্বব্যাপি পুলিশের দর্শন এবং মূলনীতি হলো অপরাধ দমন এবং অনিয়মকে প্রতিহত করা। এই দর্শন এবং মূলনীতিকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাষ্ট্র গঠন করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বাংলাদেশ পুলিশের সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুলতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাব বিস্তর। তারপরও তাদের সবাই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, সারা বছরই প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে পুলিশই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সমালোচিত।
বৈশ্বিক অদৃশ্য অনুজীব করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের অগ্রনী ভূমিকা ইতিমধ্যে সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। তৃনমূল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মানবিক পুলিশিং এর গল্প সবার মুখে মুখে, অনেকেই বলছেন করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশকে নতুন রুপে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন আপামর জনসাধারণ এবং সেটাও ইতিবাচকভাবেই। মানবিক পুলিশের অনন্য উদাহরণ হিসেবে করোনা সংকট মোকাবেলায় পুলিশের বৈচিত্র্যময় ভূমিকাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ, সংস্কৃতি, অভিবাসন, অভিগমন ইত্যাদিকে বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে যখন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা জনবান্ধব পুলিশিং ব্রতী, ঠিক তখনই মানবিক পুলিশিং এর অব্যাহত চর্চা লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃত অর্থে পুলিশ বাহিনীর প্রত্যেকটি কাজই মানবিক ও গ্রহণযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয় কিন্তু বিভিন্ন ধরনের প্রভাব, প্রতিপত্তি, পক্ষপাতিত্ব, পদায়ন জটিলতা, রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি প্রভূত কারণে পুলিশ সদস্যরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে পুলিশ সম্বন্ধে নানা রকমের নেতিবাচক খবরের শিরোনামও পত্রিকার পাতায় মোটা অক্ষরে ছাপা হয়ে থাকে। সেসব সমালোচনা বহুলাংশে সঙ্গতও। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, সারা বছরই কোনো আশ্রয় থাকুক বা না থাকুক, যত দুর্যোগই হোক বা সংকট আসুক-পুলিশ থাকে রাস্তায়, জনগণের সেবায়। জনগণ ঘুমায়, পুলিশ পাহারায় থাকে বলেই। করোনা পরিস্থিতির প্রথম দিকে যখন সবাই ঘরমুখী হয়, সেসময় অদৃশ্য অনুজীব করোনা ভাইরাস মোতাবেলায় পিপিই, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ছাড়াই পুলিশ রাস্তায় থেকেছে বা থাকছে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা অগ্রগণ্য না করেই। গ্রামে বা শহরের রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজারে হাজার হাজার মানুষের জনস্রোতের মধ্যে যে কেউ বইতে পারে এই প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ ভাইরাস; তারপরও নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রিয়জন ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ভাবনা উপেক্ষা করেই পুলিশ রাস্তায় থাকছে।
কোভিড-১৯ প্রথম দিকে পুলিশের সরকারি দায়িত্ব ছিল অতি প্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগ রক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি মানানোর এবং অযথা জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে ঘরমুখী করা। কিন্তু কোভিড-১৯ কারণে মানবিক বিপর্যয় যখন তুঙ্গে, আপনস্বজনরা যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তখন করোনা আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর পাশে দাড়িয়েছে পুলিশ, জঙ্গলে ফেলে যাওয়া মাকে, জ্বর নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা যুবককে কিংবা করোনা রোগীকে হাসপাতালে নিয়েছে ও নিচ্ছে পুলিশ। করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফন করার কেউ নেই তখন পুলিশ লাশ কাঁধে নিয়েছে ও নিচ্ছে, দাফন করেছে। আজ পুলিশের গাড়ির জন্য অপেক্ষা অসহায় অভুক্তদের, কারণ নিজেদের অর্থে ক্ষুধার্তকে রাতের আঁধারে খাবার পৌঁছে দিয়েছে ও দিচ্ছে। পুলিশ নিজ উদ্যোগে হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, মৌসুমি ধান কাটতে সহায়তা প্রদান ইত্যাদি ইতিবাচক ও মানবিক কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদন করার বিষয়গুলি মিডিয়া ও সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিবাচকভাবে প্রচার হওয়ায় সকলের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। এত সব কাজের মাঝে পুলিশের নিত্যকার রুটিন দায়িত্ব তো আছেই। রমজানে এমনিতেই অসাধু ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো থাকে। এই মহাদুর্যোগে কিছু মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগ বেড়েছিল পাল্লা দিয়ে। তাও সামলাতে হয়েছে পুলিশকে। সরকারের ত্রাণসামগ্রী জনদরদীখ্যাত কিছু দুর্বৃত্ত লুটছে, স্বাভাবিকভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশকে নিতে হয়েছে গুরুদায়িত্ব। ১৫জন পুলিশ সদস্য এই করোনা যুদ্ধে দেশের সেবায় আত্মোৎসর্গ করেছে, আর সংক্রমিত প্রায় চার হাজার’। তাদের পরিবারও বিসর্জন দিচ্ছে অনেক কিছু। তবু অবিচল এই সম্মুখযোদ্ধারা লড়াইয়ে বিন্দু মাত্র ক্ষান্ত হয়নি। আমরা সবাই সচেতন আর সৎ হলে হয়তো পুলিশ বা প্রশাসনের ঘাড়ে এসব বাড়তি দায়িত্ব কমে আসত। কিন্তু সব ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। আমাদের নির্বুদ্ধিতা, নির্লিপ্ততা এবং বহুক্ষেত্রে হঠকারিতা সম্মুখযোদ্ধাদের তাদের কাজের পাশাপাশি ঝুঁকি ও বিপদ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে প্রভাবশালী, রাজনীতিবিদ প্রত্যেকেই একযোগে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশের ভূমিকাকে ঈর্ষণীয় অবস্থায় গ্রহণ করেছে। আমরা সারা বছরই পুলিশকে নিয়ে মুখরোচক সংবাদ শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করতে দেখি। অথচ পুলিশের ইতিবাচক কাজের সংবাদ তেমন ফলাও করে প্রচার হয় না সংবাদমাধ্যমগুলোতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত প্রচেষ্টায় বর্তমান পুলিশের থানা ফাঁড়ির ৪০% দৃষ্টিনন্দন বিল্ডিং ও আবাসস্থল তৈরি হওয়ায় থানা ফাঁড়ির স্থাপনা সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হয়েছে। কিন্তু থানা ফাঁড়ির লজিস্টিক সাপোর্ট এখন অপর্যাপ্ত। জনগণের দারপ্রান্তে মানবিক পুলিশিং সেবা পৌছাতে হলে থানা ফাঁড়িতে অন্যতম দুটি গাড়ি, পাঁচটি মোটরসাইকেল, পর্যাপ্ত জ্বালানি তৈল সরবরাহ ও আনুসাঙ্গিক সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করা জরুরী। থানা ফাঁড়িতে সৎ, যোগ্য ও কর্মনিষ্ঠাবান অফিসার ও পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্টে দেয়া সম্ভব হলে এই মানবিক পুলিশগুলিকে বছরজুড়েই দেখা যাবে দৃশ্যমান ভাবে। এসব বিষয় নিয়ে কখনও মিডিয়াতে ফলাও করে সংবাদ পরিবেশন করতে দেখা যায় না। তবে এ কথাটি অত্যন্ত সত্য যে, পুলিশের ইতিবাচক সংবাদের তুলনায় নেতিবাচক সংবাদকে বিশেষ ফোকাস করে মিডিয়াতে প্রকাশ করা হয় জনগণের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। পুলিশ মন্দ কাজ যেভাবে মিডিয়ায় আসে কিন্তু করোনা মহামরী দুর্যোগের ভাল কাজগুলি সেভাবে মিডিয়ায় আসে নাই। ফলে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে বেশির ভাগই আসেনি। তাই এই নিরলস ও আন্তরিকতার একদিন জাতির কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। কোনো একদিন এই ক্রান্তিকাল হয়তো শেষ হবে। সবাই ফিরে যাবে চেনা কর্মজীবনে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, আতঙ্ক আর বিয়োগের এই করোনাকাল দুঃসহ সব স্মৃতির সাক্ষী হয়ে থাকবে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে পুলিশ যেভাবে জীবনের পরোয়া না করে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, পেশাদারিত্বের ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে এটা আশা রাখি।

লেখকঃ মোহাম্মদ সাব্বির রহমান, অফিসার ইনচার্জ, নানিয়ারচর থানা।

মন্তব্য

মন্তব্য