শাহ নেয়াতুল্লা কলেজের ৪ শিক্ষার্থীর একটি বছর কেড়ে নিলো অধ্যক্ষের ভাই খাইরুল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ইসাহক আলীঃ একটি বছর ঝরে গেল চার শিক্ষার্থীর জীবন থেকে। বেকারত্ব বাড়ছে, আর একজন শিক্ষকের কারণে এক একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর একটি বছর, কি অপুরনীয় ক্ষতি। ভাবাই যায় না। এমনই চাঞ্চল্যকর ঘটনা, শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অধ্যক্ষের দূর্ণীতি অনিয়মের পর এবার অধ্যক্ষ্যের ভাই একই কলেজের অনার্স বিভাগের রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষক মো. খাইরুল ইসলামের দূর্ণীতির কারণে পরীক্ষা দিতে পারলোনা শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অনার্সের ৩য় বর্ষের ৪ শিক্ষার্থী। কলেজের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের অনার্স ৩য় বর্ষের ৪ শিক্ষার্থী হলো, রাইহান আলী (রোল নম্বর-৩৫৩) ১১,১২০/-টাকা, আহাদ আলী (রোল নম্বর-৩৬৮) ১১,৫০০/-টাকা, মো. আতাউর রহমান (রোল নম্বর-৩১৫) ৭৫০০/-টাকা ও মো. ইউসুফ আলী (রোল নম্বর-৩০৫) ১১,৫০০/-টাকা।
এসব শিক্ষার্থীরা কলেজের অনার্স বিভাগের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. খাইরুল ইসলামের কাছে সময়মতই ফরমপুরণের টাকা জমা দেয়। কিন্তু এই টাকা খাইরুল ইসলাম বাবু নিজের কাছেই রেখে দেন। ৪ শিক্ষার্থীর ফরমপুরন না করেই টাকা আত্মসাৎ করেন এবং শিক্ষার্থীদের ফরমপুরন না হলেও তিনি কোন ব্যবস্থাও নেননি। যেন তিনি বিষয়টি জানেনই না। গত ৩ ফেব্রুয়ারী পরীক্ষা দিতে এসে জানাতে পারে ওই ৪জন ছাত্র যে, তাদের ফরমপুরন হয়নি এবং তারা ৩য় বর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে পারছে না। তাৎক্ষনিক বিভাগের শিক্ষকদের জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা হয়নি। শিক্ষক খাইরুল ইসলাম বাবুও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি। পরে শিক্ষার্থীদের কাছে ভুল হয়েছে, বলে স্বীকার করেছেন বলে জানায় ওই ৪ শিক্ষার্থী।

এই ৪জন শিক্ষার্থীর এই ক্ষতির দায়ভার কে নেবে, কলেজের অধ্যক্ষ, নাকি ভাই খাইরুল, না বিভাগের প্রধান। এমনই নানা প্রশ্ন। অনার্স পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জীবন এখন অনিশ্চিত। এব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্থ ও ভূক্তভোগী শিক্ষার্থী রাইহান, আহাদ, আতাউর ও ইউসুফের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানায়, শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অনার্স বিভাগের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক মো. খাইরুল ইসলামের কাছে ফরমপুরণের টাকা জমা দিই আমরা। কিন্তু এই টাকা শিক্ষক খাইরুল ইসলাম বাবু ৪ জনের ফরমপুরন না করেই টাকা আত্মসাৎ করেন এবং শিক্ষার্থীদের ফরমপুরন না হলেও তিনি জানান নি বা কোন ব্যবস্থাও নেননি। গত ৩ ফেব্রæয়ারী পরীক্ষা দিতে কলেজে এসে জানাতে পারি, আমাদের ফরমপুরন হয়নি। আমরা ৩য় বর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে পারিনি। তাৎক্ষনিক বিভাগের শিক্ষকদের জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা হয়নি। শিক্ষক খাইরুল ইসলাম বাবুও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি। ৩ ফেব্রæয়ারী থেকে ৯ ফেব্রæয়ারী রবিবার পর্যন্ত ৩টি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে, আমাদের বিষয়ে কোন মাথাব্যাথা বা অনুশোচনা পর্যন্ত নেই ওই শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের।আমাদের জীবন থেকে একটি বছর ঝরে গেল, এমনিতেই বেকার সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারপও একটি বছর। আমরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা করা এই শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এমন বিচারের ব্যবস্থা নেয়া হোক, যেন আর কোন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে অবহেলা বা ছিনিমিনি না করে।

ভূক্তভোগী ছাত্র শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের ইউসুফ জানায়, বাড়ি থেকে পিতার পাঠানো টাকায় মাসে ৫/৬ হাজার টাকা খরচ করে লেখাপড়া করি। কলেজের সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকের কাছে টাকা জমা দিয়েও আমার ফরমপুরন হয়নি এবং ৩য় বর্ষের পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে পারিনি। আমি ১ম বর্ষের পরীক্ষায় ৩য়, দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষায় ১ম হয়েছি। আর ৩য় বর্ষের পরীক্ষায় তো অংশ গ্রহণই করতে পারলাম না। আমার জীবন থেকে একটি বছর বাদ হয়ে গেল। এক বছর শহরে থেকে আবারও লেখাপড়া করতে ৭০/৮০ হাজার টাকা খরচ করতে হবে এবং আবারও পরীক্ষার ফরমপুরণ করতে হবে। এ খবর পেয়ে আমার বাবা আমাকে বাড়িতে ডেকে পাঠায় এবং কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে বলে। এজন্য বাড়িতেই আছি। আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা হোক।

এছাড়া, শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, খাইরুল ইসলাম বাবু শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল ইসলামের ভাই হওয়ায় বিষয়টিকে কোন গুরুত্বই দিচ্ছেন না। অন্যদিকে খবর নিয়ে জানা গেছে, শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল ইসলামের ভাই খাইরুল ইসলাম বাবু’র ‘শিক্ষক নিবন্ধন’ না থাকলেও অনার্স বিভাগের শিক্ষক হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং অধ্যক্ষের ভাই বলেও এই অনিয়ম করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে খাইরুল ইসলাম বাবুকে।

এদিকে, শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও দূর্ণীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, অর্থ লুটপাট, শিক্ষক নির্যাতনসহ নানা বিষয় তুলে ধরে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে। অধ্যক্ষের দূর্ণীতি-অনিয়মের বিষয়গুলোও তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এবাপারে অভিযুক্ত শিক্ষক খাইরুল ইসলাম বাবু ৪ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, ৪ শিক্ষার্থীর ফরমপুরনের টাকা জমা দেয়া হয়েছে, কিন্তু অনিবার্য কারণবশত ফরম পুরন হয়নি। শিক্ষার্থীদের এক বছর ঝরে যাওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে, তিনি কোন সদুত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে ফোন দিলেও রিসিভ করেননি।
এদিকে, অধ্যক্ষের ভাই খাইরুল ইসলাম বাবুকে কলেজের প্রায় সকল কমিটিতেই সদস্য রাখা হয় এবং এই ভাইয়ের মাধ্যমেই সকল দূর্ণীতি ও অনিয়মের কাজ সারেন অধ্যক্ষ, বলে কলেজের একাধিক সুত্র জানিয়েছে। ৪ শিক্ষার্থীর এই বিষয়টিও অধ্যক্ষ সাহেব জানেন। ভাইকে জানিয়েই খাইরুল ইসলাম বাবু এই ৪ শিক্ষার্থীর টাকা নিয়েও তাদের ফরম পুরণ করেন নি। বিষয়টির উপযুক্ত শাস্তির অপেক্ষা করছেন কলেজের শিক্ষার্থী ও সচেতন শিক্ষকগণ।

বিষয়টি নিয়ে শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি জানেন না। আগে জানতে পারলে হয়তো ৪ শিক্ষার্থীর জন্য জরিমানা দিয়ে হলেও পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেত। অনার্স বিভাগের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বা শিক্ষক খাইরুল ইসলামও কোন কিছু জানাই নি। এবিষয়ে তদন্ত করে, দোষী যেই হোক, বিধিমোতাবেক প্রয়োজনীয় শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মন্তব্য

মন্তব্য