রাজা নেই,রাজ্য নেই,তবুও রাজারহাট


সাইফুর রহমান শামীম,কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি //

রাজা নেই, নেই কোন রাজ্য। নেই রাজাদের আনাগোনাও। তবুও রাজারহাট। দেশের উত্তারা লের সীমান্ত ঘেষা কুড়িগ্রাম জেলার একটি উপজেলার নাম এটি। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৭ সালে লালমনিরহাট থানার ৩টি এবং কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে রাজারহাট ইউনিয়নের নাম থেকে নামকরন করা হয় রাজারহাট থানা। ১৯৮৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রাজারহাট উপজেলার কার্যক্রম শুরু হয়।
রাজারহাটে রাজার কোন আনাগোনা না থাকলেও আছে অনেক অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য। এখনও এসব অতীত ঐতিহ্যের স্বাক্ষী বহন করছে নানা গুরুত্বপুর্ণ স্থাপনা ও জমিদারী প্রথা।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ১৪শ খ্রীষ্ট্রাব্দের শুরুর দিকে এ অ লে রাজ ও জমিদারী প্রথা প্রচলিত ছিল। উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের পাঁঙ্গা রাজ বংশের সর্বশেষ রাজা ছিলেন দেবেন্দ্র নারায় কোঙর। তার রাজত্ব ছিল রাজারহাট উপজেলা ও লালমনির হাট জেলা সদরের বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে। অপরদিকে বর্তমান রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঁঙ্গা, বিদ্যানন্দ ও চাকিরপশার ইউনিয়নের বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে রাজত্ব ছিল ঘড়িয়াল ডাঁঙ্গার জমিদার শরৎ চন্দ্রের।
জনশ্রুতি আছে, লালমনিরহাট ও রংপুর অ লের কয়েকজন রাজা ও জমিদারদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও যাতায়াত ছিল রাজারহাটের রাজা ও জমিদারদের। সে সময় পাঁঙ্গা রাজার শেষ বংশধর রাজা দেবেন্দ্র নারায়ন কোঙর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রাদি ক্রয়ের জন্য এই এলাকায় একটি বাজারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ফলশ্রæতিতে তিনি তার নিজস্ব খাস জমির উপর বাজার গড়ে তোলেন। রাজার জমিতে বাজার গড়ে উঠার কারনে সেই সময় স্থানীয় লোকজন বাজারের নামকরন করেন রাজারহাট। এটি ইতিহাস বিদদের প্রসিদ্ধ মত। তবে কারো কারো মতে, ব্রিটিশ আমলে রাজারহাট বলে কোন নাম ছিল না। এই এলাকার রেল লাইন দিয়ে চলাচল করত বাস্পিয় ইঞ্জিন চালিত লেংটাগাড়ি। অত্যন্ত ধীর গতিতে চলাচল করত এই গাড়ি। গাড়ি যে স্থানে থামত তার নাম ছিল পয়ামারী। পয়ামারীর আশেপাশে কিছু দোকানপাট ছিল। পাঁঙ্গা রাজবংশের সর্বশেষ বংশধর রাজা দেবেন্দ্র নারায়ন কোঙ্গর মেকুরটারী মৌজার প্রজাদের সাথে মাঝে মধ্যেই সাক্ষাত করার জন্য আসতেন। ধীরেধীরে সেখানে দোকানপাট বাড়তে থাকে। একারনে রাজার খাস জমির উপর হাটটি লাগানো হয়। জায়গাটি পাঁঙ্গা রাজার হওয়ার কারনে হাটটির নামকরন করা হয় রাজারহাট।
১৬ হাজার ৫৫৯ বর্গ কিলোমিটার আয়োতনের রাজারহাট উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ২লাখ ৫০ হাজার লোকের বসবাস। তিস্তা ও ধরলা নদী বেষ্টিত রাজারহাট উপজেলায় এখন ১শ ৮০টি মৌজা। রাজা নেই,রাজ্যও নেই,তবে এখনো শেষ স্মৃতি চিহ্ন বহন করছে অনেক রাজকীয় স্থাপনা। এরমধ্যে পাঁঙ্গা জমিদার বাড়ির শেষ স্মৃতিচিহ্ন আজ ধ্বংসের পথে। ঘড়িয়ালডাঁঙ্গা জমিদার বাড়ির শেষ স্মৃতিচিহ্ন টুকুও নেই। রয়েছে শুধু পরিত্যাক্ত ঘড়িয়ালডাঁঙ্গা রাজ মন্দির, কোটেশ্বর শিব মন্দির ও চতুর্ভূজ মন্দির। তবে জমিদারী প্রথা চলাকালে বিভিন্ন স্থানে নির্মিত স্থাপনার মধ্যে এখনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চাঁন্দামারী মসজিদ, ব্যাপারীপাড়া শাহী জামে মসজিদ, বালাকান্দি জামে মসজিদ ও পাইকপাড়া জামে মসজিদ। এছাড়া রানী লক্ষিপ্রিয়া পুকুর, কিংবদন্তির সিন্দুরমতি পুকুর, চাকলার দিঘি আজো চাকিরপশার বিল ঐতিহ্যের স্বাক্ষ্য বহন করছে।
বর্তমান রাজারহাট উপজেলায় ৭টি ইউনিয়ন রয়েছে। এরমধ্যে ১২৯টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩২টি উচ্চ বিদ্যালয়, ২৩টি মাদ্রাসা এবং ১৪টি কলেজ রয়েছে। মসজিদ রয়েছে ৩২০টি ও মন্দির ৫৭টি। ঈদগাহ মাঠ ১৩টি এবং পুঁজা মন্ডপ ১১৫টি। রেল ষ্টেশন ২টি। কমিউনিটি ক্লিনিক ৬টি। হাটবাজারের সংখ্যা ১৬টি। ডাকঘর ৮টি । নদী তিস্তা ও ধরলা-২টি। দর্শনীয় স্থানের মধ্যে সিন্দুরমতির পুকুর, অচীনগাছ, ঠাটমারী বদ্ধভূমি স্মৃতিস্তম্ভ অন্যতম। কৃতি ব্যাক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, সাবেক গণপরিষদ সদস্য আব্দুল্লাহ সোরওয়াদ্দী, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব মরহুম আবু সাঈদ চৌধুরী, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের শহীদ ছাত্রনেতা রাউফুন বসুনীয়া, রাজারহাটের প্রথম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মরহুম জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী

মন্তব্য

মন্তব্য