মাছিমপুর হাইস্কুলের পাঠাগারটি এখন রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও মাদক সেবনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল

হালিম সৈকত,কুমিল্লা
কুমিল্লা জেলার তিতাস উপজেলার মাছিমপুর আর আর ইনস্টিটিউশন একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্কুলটি ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর উন্নয়ন হয়েছে মাছিমপুরের কৃতি সন্তান জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব আবদুল মতিন খানের হাত ধরে। তার প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টির আমূল পরিবর্তন ও চেহারা পাল্টে গেছে। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন বিভিন্ন ভবন নির্মাণসহ তৈরি করেছেন একটি পাঠাগার। যা এলাকাবাসী ও ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত আবশ্যক। তাছাড়া এলাকাবাসী দীর্ঘদিরে দাবী ছিল একটি পাঠাগার স্থাপন।
আবদুল মতিন খান সাহেব যে উদ্দেশ্যে পাঠাগারটি তৈরি করেছিলেন আজ তার উদ্দেশ্য সুদূর পরাহত। পাঠাগারটির এখন বেহাল দশা। এখানে পড়াশোনা তো হয়ই না। এখানে চলে দুনিয়ার সমস্ত আকাম কুকাম। অনায়াসে চলে নেশা। নেশা খাওয়া ও বেঁচা কেনার একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এটি। এখানে চলে সকাল ৮টা থেকে রাত ১/২টা পর্যন্ত আড্ডা। পাঠাগরের ছাঁদের উপর চলে নিরাপদে ইয়াবা ও ফেনসিডিল সেবন।
মাছিমপুর বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন,লাইব্রেরিটি নেশার আস্তানায় পরিনত হযেছে। এখানে বসে পত্রিকা কিংবা বই পড়ার কোন পরিবেশ নেই। কারণ এখানে সব সময় একদল ছেলেপুলে আড্ডা দেয় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন বলেন, এখানে কিছু দিন পর পরই কিসের যেন অনুষ্ঠান হয়।
খোজ নিয়ে জানা যায় এখানে চলে ছাত্রদল ও যুবদলের গোপন মিটিং। সরকার উৎখাতের সকল মিটিং এখানে বসে করা হয়। তারই অংশ হিসেবে গত ১৭ অক্টোবর রাত ৮টায় এখানে কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করা হয় ৫নং কলাকান্দি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মনির হোসেন এর।
ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ঘটনা সত্যি। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চেয়ার টেবিল, মেঝে পড়ে রয়েছে জন্মদিনে ব্যবহৃত মোমবাতি। নোংরা পরিবেশ, পাঠাগারের দায়িত্বে যিনি রয়েছেন তাকেও খোজে পাওয়া গেল না। অভিযোগ রয়েছে সে দায়িত্ব এড়িয়ে সব সময় খেলাধূলায় মত্ত থাকে। স্কুল খোলা কি বন্ধ সেটা বিষয় না। যে কোন সময় সে পাঠাগার খোলে তার পছন্দের লোকদের বিভিন্ন অসামাজিক কাজে সহযোগিতা করে। ছাত্রদল ও যুবদলের মিটিং করতে সহায়তা করে। প্রকৃতপক্ষে এটি যুবদল ও ছাত্রদলের কার্যালয়ে পরিনত হয়েছে। কিছু সংখ্যক বেকার ও নেশাখোরের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান কলুষিত হবে এটি কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যারা এখানে বসে আড্ডা দেয় প্রকৃতপক্ষে তাদের কোন কাজই নেই। রাত দিন শুধু খেলাধূলা আর পাঠাগারে বসে আড্ডা। তাদের দৈনন্দিন যে খরচ তা আসে কোথা থেকে। কে দেয় তাদেরকে টাকা? অভিযোগ রয়েছে তাদের কেউ কেউ মাদক বিক্রির সাথে জড়িত। পড়াশোনার পরিবেশ না থাকায় কেউ আসেন না এখানে। আবার কেউ কেউ আসলে নিজেরাই লজ্জা পেয়ে ফিরে যান। পায়ের উপর পা তুলে সিগারেট খাওয়া দেখে এখানে কি কেউ থাকতে পারেন ?
এর দায়ভার স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই এড়াতে পারে না। কিভাবে পাঠাগারটি চলছে তার কোন খবরই জানেন না সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য সদস্যবৃন্দ। এই যদি হয় একটি লাইব্রেরির অবস্থা তাহলে স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ কি তা সহজেই অনুমেয়।
এই বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাহফুজুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। স্বাভাবিকভাবে স্কুল খোলা থাকা অবস্থায় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪-৫টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা। কিন্তু লাইব্রেরির কেয়ার টেকার যদি রাত ১২.০০-১.০০টা পর্যন্ত খোলা রাখে তবে সে ঠিক করে নাই। আমি খোঁজ খবর নিয়ে দেখছি এ রকম কিছু হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আলম সরকার বলেন, কি বলেন, এ রকম কিছু তো আমি জানি না। যদি এখানে কোন দলের মিটিং করে কেউ অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অভিভাবক সদস্য মো. ইকবাল হোসেন বাবুল বলেন, আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম যে লাইব্রেরি এত রাত অবধি খোলা থাকে এবং এখানে কোন নেতার জন্মদিন পালন করা হয়। বিষয়টি অনৈতিক। এটি কোন রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়, যে এখানে জন্মদিনের কেক কাটবে।
আরেক সদস্য দেলোয়ার হোসেন ডালিম বলেন, আমি বিষয়টি জানি না। যদি এখানে নেশার আসর বসে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠাগার রাজনৈতিক দলের কার্যালয় আর মাদকের আখড়া হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না। সচেতন মহলের দাবী আশু দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী। ফিরিয়ে আনা উচিত লাইব্রেরির পরিবশে। যাতে সাধারণ জনগণ ও ছাত্র-ছাত্রীরা পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও জ্ঞান আরোহণ করতে পারে।

মন্তব্য

মন্তব্য