পদ্মায় ভাঙনের ৫ হাজার ৮১ পরিবার আশ্রয়হীন

অনলাইন ডেস্ক

পদ্মা সর্বনাশী

‘আমরা সাহায্য চাই না, বেড়িবাঁধ চাই। এখন ছোট-বড় নেই এখানে, সবাই সমান। বেড়িবাঁধ থাকলে রিকশা বা ভ্যান চালাইয়া, মানুষ বাঁচতে পারতো।’ চোখের জল আর সব হারানোর দীর্ঘশ্বাসে এ কথাগুলো বলেন মাহমুদা বেগম। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার পদ্মার ভাঙনের শিকার দুই সন্তানের জননী মাহমুদা বেগম। এবার নিয়ে চারবার থাকার স্থান পরিবর্তন করেছেন তিনি।

পদ্মায় ভাঙনের আরেক শিকার আজিজুল মাদবর বলেন, ‘ছয় কিলোমিটার দূরে আমার বাড়ি আছিলো, চারবার আমার বাড়ি ভাংছি, চারবার ঘর উঠাইছি। নদীর ভাঙনে শেষ হইয়া গেলাম। প্রধানমন্ত্রী যদি তাকাইতেন, তাইলে রক্ষা অইবো, এ ছাড়া আমাগো রক্ষা করার কেউ নাই।’ একই এলাকার জুয়েল ব্যাপারি বলেন, ‘পদ্মা ভাঙনের স্থান থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে ২ শতাংশ জায়গা ভাড়া নিয়ে পরিবারসহ কোনোরকমে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’ নজরুল ব্যাপারি নামে আরেকজন বলেন, ‘৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ইমারতটি মাত্র এক লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে অন্যত্র জায়গা খুঁজতেছি।’

কেদারপুর গ্রামের সুফিয়া বেগম জানান, ২০ শতক জায়গার ওপর বড় বাড়ি ছিল আমার। মুলফতগঞ্জ বাজারে দোকান ছিল স্বামী সোহেল মিয়ার। সবই কেড়ে নিয়েছে পদ্মা। দুই মাসের ব্যবধানে ভালো অবস্থান থেকে আজ আমরা ঠিকানাহীন হয়ে পড়েছি।

প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়ণ কেন্দ্র হিসেবে ৩৯টি সাইক্লোন সেন্টার। হাসপাতালের সামনে দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে বালুভর্তি পাঁচ কোটি টাকার বরাদ্দকৃত জিও ব্যাগ ফেলার কাজ অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদিনেও কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর না পাওয়া গেলেও ভাঙনের আতঙ্কে রয়েছে পদ্মাপাড়ের সবাই। নড়িয়া এলাকার বাঁশতলা থেকে ২০০ বসতঘর সরিয়ে নিয়েছে ভাঙনে আতঙ্কিত পরিবারগুলো। বাজারের পাকা দোকানগুলো থেকে নিজেদের উদ্যোগে ভেঙে ইট ও রড বের করে নিচ্ছেন মালিকরা। ভাঙনকবলিত মানুষ অভিযোগ করে বলেন, শুনেছি মন্ত্রী-এমপিরা এসেছেন। কই, আমাদের তো কোনো খোঁজখবর নিলেন না। আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে গেলেন না। তারা ভোটের সময় আসেন। তারপর তাদের আর দেখা যায় না। আমরা খাবার চাই না, টাকা চাই না, আমরা মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই ও বেড়িবাঁধ চাই।

গত এক সপ্তাহে সরকারি-বেসরকারি ভবন, মুলফৎগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বহু লোকের সাজানো-গোছানো ঘরবাড়ি ভেঙেছে। সোমবার রাতে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবনটির অধিকাংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হাসপাতাল ক্যাম্পাসের একটি আবাসিক ভবনে জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ চালু রাখা হলেও হাসপাতালে প্রবেশের সড়কটি বিলীন হয়ে যাওয়ার ভয়ে তেমন কোনো রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন না।

হাসপাতালের আরও ১১টি ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে। ফাটল দেখা দিয়েছে আরও একটি ভবনে। নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘সরকারি হিসাব অনুযায়ী পাঁচ হাজার ৮১টি পরিবার নদীভাঙনে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। নদীভাঙন ঠেকাতে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে এক লাখ ১০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। এতে পদ্মার স্রোত কিছুটা কমেছে।’

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর পানি না কমা পর্যন্ত তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। এ মুহূর্তে ভাঙন রোধ সম্ভব না হলেও বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে তীব্রতা কমানোর চেষ্টা চলছে। পানি কমলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের বলেন, ‘ইতিমধ্যে ভাঙনকবলিতদের আশ্রয়ের জন্য ৩৯টি সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত করা হয়েছে।’

ভাঙনকবলিত সব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল ও শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে টিন ও টাকা দেওয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

মন্তব্য

মন্তব্য