সর্ব শেষ জরিপে বাঘ বেড়েছে ২৪টি\ সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে বাঘ গণনার ফলাফল অক্টোবরে

মকলেছুর রহমান,তালা প্রতিনিধি :
সুন্দরবনের ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতির সর্বশেষ বাঘ শুমারিতে আগের চেয়ে বাঘ বেড়েছে ২৪ টি। বর্তমানে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ১৩০ টি বাঘ রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন জরিপ সংশ্লিষ্টরা। তিন বছর পূর্বে ২০১৫ সালের জরিপে এ সংখ্যা ছিল ১০৬ টি। শুমারি অনুযায়ী পূর্ব সুন্দরবনের প্রতি দু’কিঃমিঃ দুরত্বে বসানো ক্যামেরায় উঠে এসেছে বাঘের সংখ্যা নিয়ে এমন চিত্র। তবে এবার জরিপে ক্যামেরায় বেশ কিছু বাঘ শাবককে দেখাগেছে বলে জানিয়েছেন,সংশ্লিষ্টরা। বাঘের সংখ্যা বাড়ার সু-খবর নিয়ে বন বিভাগের পক্ষে আগামী অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে জরিপের ফলাফল। এলক্ষে দু’এক দিনের মধ্যে ফলাফল জমা দেওয়া হতে পারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে। নানা সংকটে সুন্দরবন উজাড় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গত দু’যুগে বনদস্যু-চোরা শিকারীদের শিকার হয়েছে সুন্দরবনের রেকর্ড পরিমাণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বিভিন্ন সময় উদ্ধার হওয়া বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ,বাঘের শাবক ও সর্বোপরি বাঘ শুমারি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারি হিসেবে গত ১৬ বছরে ৫৭ টি বাঘ হত্যার হিসেব থাকলেও বাস্তবে এর সংখ্যা অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন বনজীবিসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। বিভিন্ন সময়ে নানা গবেষণা,ব্যক্তি বা সংস্থা বাঘ হ্রাসের কারণ হিসেবে নানা মন্তব্য করলেও বনজীবি ও বন বিশেষজ্ঞরা আশংকাজনকহারে বাঘ হত্যার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মূলত বনবিভাগসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দূর্বলতাকেই দায়ী করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালের তথ্যানুযায়ী সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৬টি। এরপর সংখ্যা নিয়ে নানা বিতর্ক ও মতপার্থক্যের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে ফের শুরু হয় বাঘ শুমারী। মাঠ পর্যায়ে এর কাজ মে’মাসের মধ্যে শেষ হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল অক্টোবরে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন,বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির।
এর আগে ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই আমেরিকার দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে প্রকল্পে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে বাঘ গণনার জন্য খুলনা বিভাগীয় বণ্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষন বিভাগ পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের প্রায় ২৬ ভাগ এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে জনবল ও ৭০টি ডিজিটাল ক্যামেরা সরবরাহ করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে থেকে মে পর্যন্ত ফের পরিচালিত বাঘ প্রকল্প সুন্দরবনের ৩ টি অভয়ারণ্য এলাকার প্রায় ৩৬ ভাগ এলাকায় গাছের সাথে ক্যামেরা বেঁধে ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে গণনার কাজ শেষ করে। ২০১৫ সালে ট্রাপিং পদ্ধতিতে সুন্দরবনে বাঘ শুমারী অনুযায়ী জানাজায়,সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে মোট ১০৬ টি বাঘের অস্তিত্ব রয়েছে। এর আগে পাগ মার্ক পদ্ধতির শুমারী অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৫০ টি। সে অনুযায়ী মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে সুন্দরবন থেকে বাঘ কমেছে ৩৪৪টি। ২০০৪ সালের এক গবেষনায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। এর মধ্যে পুরুষ ১২১টি,স্ত্রী ২৯৮টি এবং বাচ্চা রয়েছে ২১টি। সূত্র জানায়,১৯৭৫ সালে প্রথম বেসরকারি পর্যায়ে বাঘ জরিপ করেন,জার্মাণ প্রাণী গবেষক হেন রিডসে। তার দেয়া তথ্যানুযায়ী ঐ সময় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৫০টি। প্রসঙ্গত,২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে থাইল্যন্ডের হুয়ানে অনুষ্ঠিত হয় টাইগার রেঞ্জ দেশ সমূহের ‘এশিয়া মিনিষ্ট্রয়াল কনফারেন্স’। সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষনে ৯দফা পরিকল্পনাসহ সিদ্ধান্তের আলোকে প্রতি বছর ২৯ জুলাই বাংলাদেশ সহ বাঘ সমৃদ্ধ দেশ সমূহে পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব বাঘ দিবস।
সূত্র জানায়,২০১৫ সালে মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে সবোর্চ্চ ৯ টি বাঘের চামড়া উদ্ধার হয়। এর মধ্যে কয়রার গোলখালী থেকে অক্টোবর মাসে একসাথে ৩ টি বাঘের চামড়া উদ্ধার হওয়ায় বনবিভাগের ভূমিকা নিয়ে রীতিমত প্রশ্ন দেখা দেয়। ঐ বছরের ৮ আগস্ট ৬৯ পিচ বাঘের হাড়সহ কয়রার এনায়েত হোসেন ও বাবু হোসেন নামে দু’চোরা শিকারীকে খুলনার লঞ্চ ঘাট এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের রমজাননগরের টেংরাখালী গ্রামের চোরা শিকার দের দ্বারা পাচারকৃত ৪ টি বাঘের শাবক উদ্ধার হয় ঢাকার শ্যামলী থেকে।
২০১৫ সালের ৬ জুলাই প্রকাশিত বাঘের ঘনত্ব শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয় অবৈধ শিকার,খাদ্যের অভাব ও প্রকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবনে বাঘের অস্থিত্ব কমেছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়,বনদস্যুসহ চোরা শিকারীদের বাঘ শিকার,সুন্দরবনের ভেতরের নদী সমূহে নৌচলাচল ও বনের পাশে শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ বাঘের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও এনিয়ে সরকার সুন্দরবন রক্ষায় আন্দোলনকারীদের কেউ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নয় বা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে সুন্দরবনের যে পরিবেশের ক্ষতি হবে এবিষয়েও তাদের কাছে কোন ব্যাখ্যা নেই দাবি করার পর গত প্রায় ১০ মাস পূর্বে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন(বাপা) এর পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের কাছে ১৩ টি গবেষণা প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ ৩২০ টি প্রকল্প চলমান থাকলে সুন্দরবনের কি পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তা ঐসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১০ মাস আগের জমা দেয়া প্রতিবেদন সম্পর্কে সরকারের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোন জবাব পাওয়া যায়নি বলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি গত ২৭ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে জাতিসংঘের সর্বশেষ দৃঢ় বিবৃতি,সুন্দরবন রক্ষায় অবিলম্বে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেপরোয়া শিল্প স্থাপন বন্ধের দাবিতে শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বন সংরক্ষক কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মন্দিরা বলেন,সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এখন পর্যন্ত সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১০৬টি। খুলনা সার্কেলের উপ-বন সংরক্ষক মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন,বাঘ গনণার প্রতিবেদন প্রকাশিত না হলে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে আগের চেয়ে এবার অধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে গণনা কার্যক্রম হয়েছে। বাঘ প্রকল্পের গবেষনা কর্মকর্তা মোঃ আব্দুলাহ আল মোজাহিদ বলেন,প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাঘের প্রতিবেদন অক্টোবরের দিকে প্রকাশ করবে সরকার। আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণার পূর্বে বাঘের সঠিক সংখ্যা বেড়ে ঠিক কি পরিমাণ হয়েছে তা বলা যাচ্ছেনা।
পশ্চিম বন বিভাগীয় কর্মকর্তা মোঃ বশিরুল-আল-মামুন বলেন,বাঘ শুমারী একটা কঠিন কাজ। আগের যেকোন সময়ের চেয়ে এবার আধুনিক পদ্ধতি গনণা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশ না হলে কিছুই বলা যাচ্ছে না।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের সূত্র জানায়,সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের লোকালয়ে ঢুকে পড়ে গণ পিটুনি,২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের জলোচ্ছ¡াসে,বার্ধক্যজণিত কারণে এবং চোরা শিকারীদের হাতে মোট ১৭ টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার মারা পড়েছে। এর মধ্যে বন সংলগ্ন মংলা ও শরণখোলা উপজেলার লোকালয়ে ঢুকে পড়লে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা,স্বাভাবিক মৃত্যু হয় ৪ টি ও সিডরের জলোচ্ছ¡াসে ১ টি বাঘ মারা যায়। আর ৮ টি নিহত হয় চোরা শিকারীদের হাতে। একই সময়ে ১ নারী সহ মোট ২৬ জন বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। এদের মধ্যে ময়না নামের মংলার জয়মনি এলাকার বৃদ্ধা গ্রামবাসী ছাড়া সবাই বনজীবি।
সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয কর্মকর্তা বশিরুল আল মামুন জানান,গত দু’দশকে পশ্চিম বন বিভাগে ১৫ টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিহত হয়। এর মধ্যে লোকালয়ে ঢুকে গণপিটুনির শিকারে নিহত হয় ৮ টি। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারী পর্যন্ত  প্রায় দু’দশকে সেখানে ২৩৪ জন নারী-পুরুষ বাঘের আক্রমণে নিহত হয়েছেন। যাদের অধিকাংশই বনজীবি ও সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে চিংড়ি রেণু আহরণকারী।
সুন্দরবনের বণ্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা(ডিএফও) মোঃ মদিনুল আহসান বলেন,সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে সরকার ’বাংলাদেশ টাইগার এ্যকশন প্ল্যান ২০০৯-১৭ বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে বাঘ রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি,বাঘের আক্রমণ থেকে বন সংলগ্ন লোকালয়ের জানমাল এবং মানুষের হাত থেকে লোকালয়ে চলে আসা বাঘ রক্ষায় ৮৯ টি টাইগার রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন,গত ১০ বছরে মানুষের হাতে ৯ টি বাঘ মারা পড়েছে। লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ রক্ষায় ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআর) কাজ করছে। বাঘ অচেতনে তাদের ৬ টি বন্দুক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সুন্দরবনের রেকর্ড সংখ্যক বাঘ হ্রাসের জন্য অন্যান্য কারণের সাথে বনজীবিরা জোর দিয়ে যোগ করেছেন বনদস্যু। দীর্ঘ দিন সুন্দরবনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থেকে তারা জীবিকা নির্বাহ করছেন। কাছ থেকে দেখেছেন অনেক কিছু। তারা বলছেন,প্রায় দু’যুগ ধরে সুন্দরবনে নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রায় ২ ডজন বনদস্যু বাহিনী। একই বনে বাঘের সাথে বসবাস দস্যুদেরও। সুন্দরবন অভ্যন্তরে অবাধ বিচরণ ও রাত্রি যাপনে বাঘের সাথে দেখা হলেই দস্যুরা তাদের হত্যা করে। এর সাথে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে সুন্দরবনের বাঘের চাহিদার বিষয়টিকে যোগ করে এতে বনদস্যুদের দস্যুতাবৃত্তির পাশাপাশি অধিক মুনাফা লাভে বাঘ হত্যার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। অভিযোগ রয়েছে,বাঘ বিলুপ্তির জন্য দায়ী চোরা শিকারীদের গ্রেফতার ও মামলায় র‌্যাবসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপরতা দেখালেও বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষন বিভাগের তেমন কোন সফলতা নেই।
জানাগেছে,মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সীমান্তে আন্তর্জতিক বাজার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এ সুন্দরবনের চামড়া থেকে শুরু করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চড়া মূল্য থাকায় মূলত সুন্দরবনে বনদস্যুরা বাঘ হত্যায় মেতে উঠে। সুন্দরবন বনদস্যুদের এক সময়ের অভয়ারণ্য থাকায় ঐসময়ে ব্যাপক সংখ্যক বাঘ শিকার হয় তাদের হাতে। বর্তমানে সরকার সুন্দরবন রক্ষায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তা বাঘ রক্ষায় ঠিক কি ধরণের প্রভাব ফেলছে তা নির্ভর করবে চলতি ক্যামেরা ট্রাপিংয়ে বাঘ শুমারীতে বাঘের প্রকৃত সংখ্যার উপর। তবে আশার কথা,বাঘ সংরক্ষণে মনিটরিং,টহল ব্যবস্থা জোরদার এবং বনরক্ষীদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তবে কতগুলো বাঘ হত্যা করা হয়েছে বা এনিয়ে ঠিক কতটি মামলা হয়েছে এ ব্যাপারে কোন সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও  জনববল সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট হয় বন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে।

মন্তব্য

মন্তব্য