আইনজীবী দ্বারা প্রতারিত হলে কি করনীয়

বিচারব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একজন আইনজীবীর মক্কেলের প্রতি তাদের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা উচিত। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের কতিপয় আইনজীবী মক্কেলের প্রতি তাদের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞাত নন। মক্কেলরা অনেক সময় নিজ আইনজীবী দ্বারা হয়রানির শিকার হন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আইনজীবীর কাছ থেকে এ ধরনের পেশাগত অসদাচরণ ও প্রতারণার অভিযোগ অনেক সময়ই পাওয়া যায়। আমাদের সমাজে এরকম বহু মানুষ পাওয়া যাবে, যারা মামলা চালাতে গিয়ে অসৎ আইনজীবীর পাল্লাায় পড়ে সর্বস্বন্ত হয়েছেন। এর কারণ হলো- যে মহান নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই পেশার উদ্ভব, বর্তমান যুগে অনেক আইনজীবীই সেই একাগ্রতা ও সততার চূড়ান্ত উৎকর্ষতা থেকে বিচ্যুত। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, জামিনের বা বিভিন্ন জায়গায় ঘুষ দেয়ার নাম করে টাকা খাওয়া, শুনানির দিনে উপস্থিত না হওয়া, ব্যস্ততা দেখিয়ে মক্কেলকে ঘোরানো, বিপক্ষের সঙ্গে লেনদেন করা কিংবা নিজ মক্কেলের সঙ্গে প্রতারণার মতো বিষয়গুলোর শিকার হচ্ছেন অনেক অসহায় বিচারপ্রার্থী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা বিচারের আশায় নীরবে এই নিগ্রহ সহ্য করে যান। অনেকেই আবার মুখ খুলতে চান না ভয়ে কিংবা জানেনই না যে আইনে এর প্রতিকার রয়েছে। অথচ এই অবস্থার শিকার যে কেউই বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আবেদনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে প্রতিকার পেতে পারেন। আইনজীবীদের পেশার সনদ প্রদান ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হলো বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। নতুন আইনজীবীদের তালিকাভুক্তির জন্য পরীক্ষা গ্রহণ, আইনজীবীদের পেশাগত আচরণের জন্য নীতিমালা নির্ধারণ, সব আইনজীবীর কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ, আইন পেশার মান রক্ষা এবং আইনজীবীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিচার করে থাকে এ প্রতিষ্ঠানটি। আইনজীবীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ‘দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার অ্যান্ড রুলস, ১৯৭২’ এবং ‘ক্যাননস অব প্রফেশনাল কনডাক্টে’ উল্লেখ আছে। বার কাউন্সিলের পরিচালনার জন্য একটি পর্ষদ রয়েছে, যার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকারবলে এই সংস্থার প্রধান। তবে আইনজীবীদের পেশাগত আচরণের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের কাছে ততটা পরিচিত নয় এবং সে কারণে ভুক্তভোগী বিচার প্রার্থীরাও জানেন না যে পেশাগত অসদাচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে এখানে অভিযোগ দায়ের করতে হয়।

অভিযোগ করার প্রক্রিয়া :
কোনো আইনজীবীর অসদাচরণের কারণে যে কোনো ব্যক্তি সংক্ষুব্ধ হলে তিনি বার কাউন্সিলের সচিব বরাবর অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। বার কাউন্সিল সাধারণত সংক্ষিপ্ত শুনানিতে অভিযোগ নিষ্পত্তি করে থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির মতো বিষয়গুলো উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হয়। তবে অভিযোগ গুরুতর হলে বা সমাধান না করা গেলে বার কাউন্সিল তা বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেয়। দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ৩৩ ধারা মোতাবেক এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত।

বিচার ও শাস্তি :
ভুক্তভোগী কোনো ব্যক্তির অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বার কাউন্সিলে বর্তমানে পাঁচটি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল থেকে দেয়া আদেশ হাইকোর্ট বিভাগের আদেশের মতো কার্যকর হবে। একজন চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্যের সমন্বয়ে একেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত। এই তিনজনের দুজন বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য এবং আরেকজন তালিকাভুক্ত আইনজীবী। তিনজনের মধ্যে যিনি অগ্রজ, তিনিই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে কোনোক্রমেই অ্যাটর্নি জেনারেল বসতে পারেন না। কোনো আদালত বা মক্কেল থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগের তদন্ত করে ৩৪ ধারা মোতাবেক শুনানির ব্যবস্থা করবে এবং তদন্ত ও শুনানিতে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হলে ৩২ ধারা মোতাবেক তা নিষ্পত্তি করে দেবে আর প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে তিরস্কার করাসহ তার সদস্যপদ স্থগিত অথবা সমিতি থেকে বহিষ্কার করার মতো শাস্তি প্রদান করার বিধান রয়েছে। সদস্যপদ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ঠিক কত দিন স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে, তার একটি মেয়াদ নির্ধারণ করে দেবে ট্রাইব্যুনাল। তবে শাস্তির প্রকার নির্ভর করে অভিযুক্ত ব্যক্তি কত গুরুতর অপরাধ করেছে তার ওপর। তবে কেউ যদি মিথ্যা বা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অভিযোগ করে এবং তা প্রমাণিত হয়, তবে তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে ৫০০ টাকা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ওই ট্রাইব্যুনালেই রিভিউ আবেদন করতে পারে। এছাড়া যে কোনো পক্ষ নিজেকে সংক্ষুব্ধ মনে করলে ট্রাইব্যুনালের রায়ের ৯০ দিনের মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারবে। হাইকোর্ট বিভাগের রায়ই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

মনে রাখতে হবে মামলা পরিচালনায় আইনজীবীর নৈতিক ও পেশাগত কর্তব্য। পেশাগত কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার জন্য অনেক সময় একজন আইনজীবীকে ভর্ৎসনা, বরখাস্তসহ বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে পারে। তাই একজন আইনজীবীর পেশাগত জীবনে এসব নীতি মেনে চলা নৈতিক ও পেশাগত কর্তব্য। আইনজীবীর সব সময়ই পেশাগত আচরণ করা উচিত। অসাধু বা অনৈতিক আচরণ একজন আইনজীবীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও সুনাম নষ্ট করতে পারে। মক্কেলের সঙ্গে সম্পাদিত সব ধরনের যোগাযোগের গোপনীয়তা বজায় রাখা একজন আইনজীবীর নৈতিক দায়িত্ব। মামলার প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সম্পর্কে যত দ্রুত সম্ভব তথ্যানুসন্ধানপূর্বক প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে তা মামলা পরিচালনায় ব্যবহার করা তার নৈতিক দায়িত্ব। একজন আইনজীবী কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতের সামনে ভুল তথ্য বা আইনের ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করবেন না। মামলায় বিচারের আগে, বিচার চলাকালে বা বিচার-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির অযৌক্তিক মন্তব্য যেমন ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতাকে হেয় করে এমন কোনো মন্তব্য; বর্ণ, জাতীয়তা, লিঙ্গ বা অন্য কোনো কারণে পক্ষপাতিত্বমূলক মন্তব্য; প্রতিহিংসা বা সহানুভূতিশীল মন্তব্য; সাক্ষ্য থেকে বাদ দেয়া হয়েছে এমন খারাপ কাজ সম্পর্কে মন্তব্য; জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির নিশ্চুপ থাকার অধিকার প্রয়োগ সম্পর্কে মন্তব্য ইত্যাদি করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

জনসচেতনায়- মোঃ সাব্বির রহমান, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত), বাঞ্ছারামপুর মডেল থানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

মন্তব্য

মন্তব্য