এমপি মোল্লার পরিবারের হাতে জিম্মি এলাকাবাসী

ঢাকা-৫ আসন * অভিযুক্ত এমপির দুই ছেলে, ভাই, জামাতাসহ অনেকে * চলছে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৮, ৪৯ ও ৫০নং ওয়ার্ড এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ডেমরা, দনিয়া, মাতুয়াইল ও সারুলিয়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসন। এ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান মোল্লা। বর্তমান মেয়াদসহ মোট তিনবার তিনি এ এলাকার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তার ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা থেকেই এলাকাবাসী তাকে নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু সেই আস্থার দেয়ালে চিড় ধরাচ্ছেন এমপিরই পরিবারের লোকজন। ঢাকা-৫ আসনের ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এখানে প্রতিনিয়ত চলছে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক-ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম। আর এসব অপকর্মে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মদদ জোগাচ্ছেন এমপি পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং তাদের অনুসারীরা। প্রভাবশালী এ ব্যক্তিদের কারণে থানায় অভিযোগ জানানো দূরে থাক, ভয়ে টুঁ-শব্দটিও করতে সাহস পান না ভুক্তভোগীরা। তবে এমপির পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য একটি চক্র অপপ্রচার চালাচ্ছে। ওই চক্রটিই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি-দখলবাজি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

ঢাকা-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় জনগণ, থানা পুলিশ, কয়েকজন কাউন্সিলর ও ক্ষমতাসীন দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, সরকারি ভূসম্পত্তি, রাস্তা ও জলাশয় দখল করা ছাড়াও স্কুল-কলেজের অর্থ লোপাট, টেন্ডারবাজি, পরিবহন চাঁদাবাজি, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল, নদীর বালু ফেলে মোটা টাকা আদায়, এমনকি নদী পথ ও এর পাড় থেকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে চাঁদা আদায় করছেন এমপি পরিবারের লোকজন ও তাদের ক্যাডাররা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লার বড় দুই ছেলে, তার ভাই, দুই জামাতা, ভাগ্নে, ভাতিজা ও চাচা পরিচয়দানকারীরা। অবশ্য এমপির ছোট ছেলের বিষয়ে কেউ কোনো বিরূপ মন্তব্য করেননি। জানা গেছে, অভিযুক্তদের কেউ-কেউ নিচ্ছেন চাঁদাবাজির ভাগ, কেউবা নিচ্ছেন দখলবাজির অংশ। দলীয় মিছিল-মিটিংয়ে প্রথম সারিতে থাকা এমপি পরিবারের অনেক আস্থাভাজনের বিরুদ্ধে রয়েছে অস্ত্র, মাদক, অপহরণ ও মানবপাচারের মতো মামলা। খোদ এমপির বিরুদ্ধেও আছে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। এ সব বিষয়ে অভিযোগ ও মামলা গড়িয়েছে থানা পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), এমনকি উচ্চ আদালত পর্যন্ত। কিন্তু থেমে নেই এমপি পরিবারের সদস্য ও তাদের অনুসারীদের দৌরাত্ম্য। তাদের লাগামহীন অপকর্মের কারণে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে ক্ষমতাসীন দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের মাঝে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডেমরার পাইটি এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা আমাদের সময়কে বলেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে সোহানী তালুকদার নামে একজনের নাম ভাঙিয়ে পাইটি দেইল্লা এলাকায় জুম সোয়েটার গার্মেন্টের দক্ষিণ পাশের ১৯ বিঘা একটি জলাশয় ভরাট শুরু করে দুর্বৃত্তরা। এ জলাশয়টি সড়ক ও জনপদের সম্পত্তি। স্থানীয়রা এতে বাধা দিলে বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। সে সময় ভরাটকারীদের বাধা না দিয়ে উল্টো এমপিপুত্র শ্যামল মোল্লা ও জামাতা রিপন এবং তাদের ক্যাডাররা এলাকাবাসীকে রুখে দেন। হুমকি দেওয়া হয়, ‘এই জায়গায় পা রাখলেই লাশ পড়বে।’ এলাকাবাসী পরে জানতে পারেন, এমপি পরিবারের সদস্যদের মধ্যস্থতায় ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে সরকারি সম্পত্তিটির দখল নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। গত ১৯ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল গ্রহণ করে এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন আগামী বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এখনো ওই জায়গায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা। জানা গেছে, এমপিপুত্র মশিউর রহমান সজল মোল্লার ছত্রচ্ছয়ায় সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করছেন বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম এবং মুসফিকুল মান্নান বায়ু। তারা টার্মিনালের সাবেক বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আলম মোল্লা হত্যাকা-ের চার্জশিটভুক্ত আসামি। এ ছাড়া এ সিন্ডিকেটে আছেন জাহাঙ্গীর, মুকুল মৃধা ও মোহাম্মদ আলী মোফা। এখানে বিভিন্ন সংগঠনের নামে গাড়িপ্রতি দৈনিক ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত চাঁদা মাত্র ৭০-৮০ টাকা। এ বাসস্ট্যান্ড থেকে শুধু সজল মোল্লার নামেই মাসে ৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা অঞ্চল এখন পরিবহন চাঁদাবাজি, রাস্তা দখল করে পার্কিং ও ফুটপাত বাণিজ্য, মাদক, জুয়া এবং ছিনতাইকারী চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা-শ্যামপুর রুটে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ লেগুনা চলে। এসব গাড়িপ্রতি দৈনিক ১০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয় সজল মোল্লার নামে, যা মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করেন বাচ্চু ও খালেক। এ ছাড়া সজল মোল্লার নামে মাসে এক লাখ টাকা পরিশোধসাপেক্ষে যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের আশপাশের রাস্তায় প্রায় ৩৫০ পিকআপভ্যান পার্ক করতে পারেন মালিকরা। এদিকটির নিয়ন্ত্রক কমিশনার দেলুর লোকজন। এদিকে সজলের নামে মাসে ২৫০ টাকা চাঁদা দিয়ে মহানগরে প্রবেশনিষিদ্ধ আড়াইশোরও বেশি সিএনজি অটোরিকশা (নারায়ণগঞ্জের নম্বর প্লেট সংবলিত) দিব্যি চলাচল করছে যাত্রাবাড়ী-চিটাগাং রোডে। এখানেই শেষ নয়, যাত্রাবাড়ী মোড়ে অবস্থিত পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া রুটে চলাচলকারী ইলিশ, গুনগুন, বিআরটিসি পরিবহনের ৩ শতাধিক বাস মালিকের কাছ থেকে মাসে আদায় করা হচ্ছে দেড় লাখ টাকা। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে তুরাগ, শিখর, অনাবিলসহ ৫ শতাধিক পরিবহনের ক্ষেত্রে গাড়িপ্রতি দৈনিক ১ হাজার ২০০ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে সজল মোল্লার নামেই অর্ধেক চাঁদা তোলেন কালেক্টররা। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায় শহীদ জিয়া শিশু পার্ক সংলগ্ন রাস্তায় অবৈধভাবে বসানো ৪ শতাধিক দোকান ও ৬ শতাধিক লাইট ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মাসশেষে সজল মোল্লার নামে দেড় লাখ টাকা তুলছেন সেলিম ওরফে চোরা সেলিম। শহীদ ফারুক সড়কে অবৈধভাবে বসানো ২ শতাধিক দোকান থেকে সজলের নামে ৫০ হাজার টাকা তোলেন কাউন্সিলর দেলুর লোকজন। শনির আখড়া এলাকায় সড়ক ও জনপদের জায়গা দখল করে খালের ওপর রীতিমতো মাটি ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে ৫ শতাধিক দোকান। এখান থেকে তার নামে দৈনিক তোলা হয় ২৫ হাজার টাকা। যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়ত ও কাঁচাবাজার থেকে সজলের নামে মাসে তোলা হয় ৩ লাখ টাকা। জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ দখলবাজি-চাঁদাবাজি
ঢাকা-৫ আসনের জলাবদ্ধতার জন্য খালগুলো ও বিভিন্ন জলাশয় দখল করে ‘চাঁদাবাজি’কেই দায়ী করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলেন, আগে শনিরআখড়া-জিয়াসরণি-গোবিন্দপুর-মৃধাবাড়ী সড়কসংলগ্ন খাল এবং কাজলা এলাকায় ঐতিহ্যবাহী সুতি খালের যে প্রশস্ততা ছিল, দখলের কারণে সেগুলো এখন নামমাত্র খালে পরিণত হয়েছে। প্রভাবশালীরা এসব খালের ওপর বাঁশ-খুঁটি, এমনকি মাটি ভরাট করে পাকা স্থাপনা গড়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ-লাখ টাকা। তার ওপর হাট-বাজার, দোকানপাটের উচ্ছিষ্ট ফেলায় পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়েছে খালের মুখগুলো। এসব দখলবাজির পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিচ্ছেন এমপি পরিবারের সদস্যরা। শুধু দখলবাজি ও চাঁদাবাজিই নয়, অপহরণ-মুক্তিপণ দাবির মতো অপরাধেও জড়িয়ে আছে এমপি পরিবারের অনুগতদের নাম। ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত মো. আলমগীর হোসেন নামে হাইকোর্টের এক মুহুরিকে গত ৯ এপ্রিল ভোরে উত্তর যাত্রাবাড়ীর ৭৬/১/জে/১ নম্বর বাসার একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করে কদমতলী থানা পুলিশ। এ ঘটনায় করা মামলায় ইয়াসিন উদ্দিন লিটন ও রোমান নামে ২ জনসহ আরও ৮ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে রোমান বর্তমানে জামিনে আছেন। ওই ঘটনার পর সায়েদাবাদ এলাকা থেকে পুলিশের হাতে অস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তার হন লিটন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিভিন্ন সময় তোলা ভিডিওচিত্রে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অধিকাংশ মিছিলে ওই দুই অভিযুক্তকে দেখা গেছে এমপিপুত্র সজল ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রথম কাতারে। মাদকের অবাধ ব্যবসা
উত্তর যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, গোবিন্দপুর, মৃধাবাড়ী, ভাঙ্গা প্রেস, গোলাপবাগ, সুতিখালপাড়, ধলপুর, মিরহাজীরবাগ ও সায়েদাবাদ এলাকায় অবাধে চলছে মাদক ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিচ্ছেন যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা। বিভিন্ন সময় পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করলেও জোর তদবির করে থানা থেকে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যান সেসব নেতাই। জানা গেছে, মিরহাজিরবাগের চন্দন কমিউনিটি সেন্টারের পেছনের মাঠ ও পাকিস্তান মাঠ, পূবালী এলাকা, শেখপাড়া শহীদ ফারুক রোড, টুইন টাওয়ারের পেছনে, মীরহাজিরবাগ ওয়াসা গলি, ধলপুর, সুতিখালপাড়, বিবিরবাগিচা, ব্রাহ্মণচিরণ, কাজলা নতুন রাস্তাসহ পুরো এলাকার ইয়াবার স্পট এবং যাত্রাবাড়ী মৎস্য আড়তের ফেনসিডিল-ইয়াবার স্পট, সায়েদাবাদ রেলগেট ও বাস টার্মিনালে গাঁজা-ইয়াবার স্পট, যাত্রাবাড়ীর জিয়া পার্ক স্পট থেকে সরাসরি এমপিপুত্র সজল মোল্লার নামে মাসে তোলা হয় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এসব স্পট নিয়ন্ত্রণ করেনÑ রুবেল, ইমরান গাজী, আজিজ মিঠু, লিটন (বর্তমানে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার), সিহাদ, আল রহমান, রতন, ভুলু, বাবু, আরশাদ, জাহাঙ্গীর, নুরী, আলো, সোর্স আলম ও কাবিলা। ডেমরা এলাকার বিভিন্ন স্পট থেকে মাসে তোলা হয় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। এমনকি জুয়ার আসর থেকেও এমপিপুত্র সজলের নামে টাকা তোলা হচ্ছে। শনির আখড়া গোবিন্দপুর পানির পাম্পসংলগ্ন স্থানে, ডেমরা এলাকায় ওলামা লীগ কার্যালয়ে, সায়েদাবাদ সুইপার কলোনির বড় জুয়ার স্পট থেকে মাসে সজলের নামে তোলা হয় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে সব অভিযোগ উদ্দেশ্যমূলক ও ভিত্তিহীন দাবি করে ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল (এমপিপুত্র) আমাদের সময়কে বলেন, সার্বিক বিবেচনায় ঢাকা-৫ আসনের পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। কোনো কারণ ছাড়াই কিছুদিন আগে বাবাকে এই আসনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে স্থানীয় একটি গোষ্ঠী, যা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। আমি কিংবা আমার পরিবারের কেউ চাঁদাবাজি অথবা কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত নই। এ ধরনের অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার বা তাদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া বাবার অনুপ্রেরণায় মাদকের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছি আমরা। এ কারণেই রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য বাবাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণাকারী ওই মহলটিই আমাদের বিরুদ্ধে অপ্রপ্রচার চালাচ্ছে। তারা নিজেরাই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি-দখলবাজি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সজল মোল্লা আরও জানান, দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অবৈধ কর্মকা-ে জড়িত থাকলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এমপির বিরুদ্ধেও অভিযোগ
দুর্নীতির মাধ্যমে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে গত ৬ ডিসেম্বর এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগটি করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও একই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সভাপতি আবুল কালাম অনু। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লা ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে পুরো নির্বাচনী এলাকা। তাদের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন সবাই। স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে শুধু স্কুল-কলেজের অর্থ আত্মসাতই নয়, তিনবার টেন্ডারকৃত সরকারি রাস্তাঘাটও রেহাই পায়নি এমপির পরিবারের সদস্য ও তাদের অনুসারীদের হাত থেকে। ৮৪ নম্বর ওয়ার্ডের সুতিখালপাড় থেকে উত্তর যাত্রাবাড়ীর ৭৬/২/ই/২৫ হোল্ডিং নম্বর বাড়ি পর্যন্ত জনসাধারণের চলাচলকৃত রাস্তা জবরদখল করে ভবন নির্মাণে ব্যস্ত তারা। এ নিয়ে অনেক চিঠি চালাচালি হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি। অবিরাম মাটি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে এলাকার জলাধারগুলো। এমপির দুর্নীতি-অনিয়ম এবং তার পরিবারের লোকজনের দৌরাত্ম্যে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা চরম ক্ষুব্ধ। বালুর ব্যবসা ও পরিবহনে চাঁদাবাজি
সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডেমরা অঞ্চলের যাবতীয় দখলবাজি, বালু-বাণিজ্য, শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচলকারী প্রতিটি ট্রলার থেকে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন এমপির মেজ ছেলে শ্যামল মোল্লা ও জামাতা রিপন। নদীতে চলাচলকারী ৩০০-৪০০ ট্রলার থেকে প্রতিদিন তাদের নামে ওঠানো হয় ট্রলারপ্রতি ১ হাজার টাকা। স্থানীরা জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা দখল করা ছাড়াও জোর করে এখন পরিত্যক্ত জমিতে বালু ফেলে মালিকদের কাছে দাবি করা হচ্ছে ৫০ থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। ৮ ফুটের কথা বলে আড়াই ফুট পর্যন্ত ভরাট করেই হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এই সিন্ডিকেটের হোতা হাবিবুর রহমান হাসু, সারুলিয়ার আজমত আলী, সালাউদ্দিন, ইস্রাফিল আলম ও আব্দুর রহমান। দখল বাণ্যিজের সিন্ডিকেটে আরও রয়েছেন পাইটির হাবিবুর রহমান হাবিব, স্থানীয় বাসিন্দা ইলিয়াস কাঞ্চন, রমজানসহ বিশাল একটি ক্যাডার বাহিনী। জানা গেছে, এমপির ভাগ্নে পরিচয়ে হাবিবুর রহমান হাসু এখন এলাকার বালু ব্যবসা, পরিবহন চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টর দেখভালের দায়িত্বে আছেন। তার সিন্ডিকেটে রয়েছেন যুবলীগ নেতা আব্দুর রহমান, মোমেন মেম্বার, আজমত আলী, ইস্রাফিল আলম, হাজি সিরাজ ও মো. আলী। ডেমরার সুলতানা কামাল সেতুর নিচে একচেটিয়া বালুর ও ইট সরবরাহের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা। সিন্ডিকেটের সদস্য আজমত আলী ডিএনডি বাঁধের দুপাশ অবৈধভাবে দখল করে প্রায় ৫০০ দোকান গড়ে তুলে দোকানপ্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা ভাড়া তুলছেন। এ ছাড়া সারুলিয়ার বিশাল গরুর হাট এবং সারুলিয়া বাজার চলছে আজমত আলীর নিয়ন্ত্রণে। তার রয়েছে অর্ধশত সদস্যের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের দৌরাত্ম্যে তটস্থ ডগাইর, বামৈল, হাজীনগর, রসুলনগর, টেংরা, পূর্ব ও পশ্চিম বক্সনগর, শুকুরসী, বালুরঘাট এলাকাবাসী। শীতলক্ষ্যা নদীর শুকুরসী ঘাটে বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন এমপিপুত্র সজল ও শ্যামলের ঘনিষ্ঠজন মোহাম্মদ আলী। ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার চৌরাস্তায় পরিবহন সেক্টরের নিয়ন্ত্রক হলেন হাসুর ভাই সেলিম ও বাদল। প্রতিটি অটোরিকশা এবং লেগুনা থেকে প্রতিদিন ১৫০ টাকা আদায় করছেন তারা। ডেমরা ও সারুলিয়া এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন আক্তার হোসেন। এসব এলাকা থেকেই মাদক ছড়িয়ে পড়ছে ডেমরা ও সারুলিয়া এলাকায়। পরিবহন ব্যবসায়ীরা জানান, এমপির আরেক জামাতা বকুল এখন যাত্রাবাড়ীর টেম্পোস্ট্যান্ড, ইলিশ কাউন্টারসহ এই এলাকার পরিবহন সেক্টরের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। এই সেক্টরের দেখভালের দায়িত্বে আছেন সায়েম। বকুলের হয়ে পিকআপভ্যানের চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন দনিয়ার হাফিজ। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাংগঠনিক কমিটি ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যেই অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ তুলে সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লাকে নিজের নির্বাচনী এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন স্থানীয় থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দ ও তাদের অনুসারীরা। যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর সভাপতিত্বে এক বর্ধিত সভায় দেওয়া বক্তব্যে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লার আত্মীয়-স্বজন প্রতিদিন পরিবহন খাত থেকে মোটা চাঁদা আদায় করছেন। সারা দেশে নাশকতার দায়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হলেও ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকায় এমপির আশীর্বাদে তারা ভালোই আছেন। ওই সভায় ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি গিয়াসউদ্দিন বলেন, এমপি ও তার পরিবারের সদস্যরা দলের নাম ভাঙিয়ে ফুটপাত থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা এবং সরকারি খাস জমিতে অবৈধভাবে হাটবাজার বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের ভয়ে কেউ এতদিন মুখ খুলতে সাহস না পাওয়ায় দলের বদনাম হচ্ছে। এমপিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার বিষয়ে বর্ধিত সভার সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম জানান, স্থানীয় এমপির অনৈতিক কর্মকা-ে বিরক্ত হয়েই তাকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন যাত্রাবাড়ী থানাধীন ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত নেতারা। এদিকে সব অভিযোগ উদ্দেশ্যমূলক ও ভিত্তিহীন দাবি করে ঢাকা-৫ আসনের এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লা আমাদের সময়কে বলেন, এই এলাকার মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া সবার কাছেই আমি জনপ্রিয়। বিভিন্ন অপকর্ম প্রশ্রয় না দেওয়ায় একশ্রেণির মানুষের কাছে আমি অপ্রিয়। স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটায় তারাই আমার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে এসব অপ্রপচার চালাচ্ছে। চাঁদাবাজি-দখলবাজি, রাস্তাঘাটের বেহালদশা, জলাবদ্ধতার বিষয়ে তিনি বলেন, তুলনামূলকভাবে ঢাকা-৫ আসনের রাস্তাঘাটসহ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকা- আশাব্যঞ্জক। অন্যান্য স্থানের তুলনায় এই আসনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অনেক ভালো। যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই স্কুলের আর্থিক সমস্যার বিষয়ে আমি জানতে পেরেছি। তবে আমাকে জড়িয়ে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তা দুঃখজনক। এ ধরনের অভিযোগে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
সূত্রে আমাদের সময়

মন্তব্য

মন্তব্য