শ্রমিক দিবস পেলো পূর্ণতা অধিকারে রয়ে গেলো অপূর্ণতা।

-সাইফুল ইসলাম———-পহেলা মে মহান মে দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দুর্বার আন্দোলনের রক্তস্রোত স্মৃতিবিজড়িত এই মে দিবস।
শ্রমিক -মালিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রতি অবিচারের অবসান ঘটাবার সূতিকাগার বলা হয় মে দিবস।প্রায় দেড়শ বছর আগে শ্রমিকদের মহান অত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় শ্রমজীবী মানুষের বিজয়ের ধারা। সেই বিজয়ের ধারায় উদ্ভাসিত বর্তমান বিশ্বের সকল প্রান্তের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষ। এরই ধারাবাহিকতয় প্রতি বছর যথাযথ মর্যাদার ও গুরুত্বের সাথে সারা বিশ্বে উদযাপিত হয়ে আসছে মহান মে দিবস। পৃথিবীর এই ভূ-খন্ডে মেহনতি মানুষের কাছে এ দিনটি একদিকে যেমন খুবই তাৎপর্য ও গুরুত্বপূর্ণ তেমনি অনেক বেশি আবেগ ও প্রেরণার। কারণ এ দিনটির মাধ্যমে তারা
( শ্রমিকরা) তাদের কাজের প্রকৃত স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই পৃথিবীর সকল শ্রমজীবীরা পহেলা মে’কে ঐতিহাসিক মে দিবস বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’পালন করে।
পহেলা মে’র পূর্বকথা:—
১৮৬০ সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রম নির্ধারণের প্রথম দাবি জানায়। কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না বলে এই দাবি জোরালো করা সম্ভব হয়নি। তখন সময়টা সমাজতন্ত্র শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। ১৮৮০-৮১ সালের দিকে প্রতিষ্ঠা করে Federation of Organaized Trades and Labor Unions of United States and Chanada ( এটি ১৮৮৬ সালে পরিবর্তন করে American Fedration of Labor নাম রাখা হয়েছিল)। এটির মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে দৈনিক মজুরি ৮ঘন্টা নির্ধারণের জন্য প্রস্তাব পাস করে এবং মালিকও বণিক শ্রেণিকে এই প্রস্তাব কর্যকরের জন্য ১৮৮৬ সালের পহেলা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়।
বণিক -মালিক শ্রেণির কোনো ধরণের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তখনকার সময়ে অ্যালার্ম নামক একটি পত্রিকা কলামে লেখা হয় ‘ একজন শ্রমিক ৮ঘন্টা কাজ করুক কিংবা ১০ঘন্টাই করুক,সে দাসই’ যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থী দলও একাত্মতা জানায়। ১মে কে ঘিরে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আয়োজন চলতে থাকে। শিকাগো হয়ে ওঠে প্রতিবাদ প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল।
১৮৭৭ সালে শ্রমিকরা একবার রেলপথ অবরোধ করলে পুলিশ ও ইউনাইটেড স্ট্যাটস আর্মি তাদের উপর বর্বর আক্রমণ চালায়। ঠিক একইভাবে ১মে পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। তখন স্থানীয় ব্যবসায়ী শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগীতা করে। একদিকে শ্রমিকরা অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, মিছিল-মিটং, ধর্মঘট, বিপ-বী আন্দোলনের সব কিছু মিলে ১মে উত্তাল হয়ে ওঠে।
শ্রমিক নেতা পার্সন্স, জোয়ান মোস্ট, আগস্ট স্পিজ, লুই লিংসহ আরো অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে শ্রমিকরা কাজ ফেলে অন্দোলনে যোগ দেন। আন্দোলন রত শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ১লাখে। ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে -মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। তখন আগস্ট স্পিজ জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশে কিছু কথা বলেছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের উপর এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে,এতে এক পুলিশ নিহত হয় এবং ১১জন আহত হন,পরে আরো ৬ জন মারা যায়। পুলিশ বাহিনীও শ্রমিকদের উপর অতর্কিত হামলা শুরু করে যা সাথে সাথেই রায়টের রূপ নেয়।রায়টে ১১জন শ্রমিক শহীদ হন।পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পিজ সহ ৮জনকে অভিযুক্ত করা হয়।১৮৮৬ সালে ৯ অক্টোবর বিচারের রায়ে তাদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হলো।কিন্তু তা মেনে নিতে পারেনি শ্রমিক নেতাদের পরিবার। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মিছিল -সভা করেও কোনো কাজ হয়নি। তাদের ঠিকই ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে। শ্রমিক নেতাদের পরিবারের সাথে দেখা করার কোনো সুযোগ দিলোনা।১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং একদিন পূর্বেই করাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন। অন্য একজনের ১৫বছরের কারাদন্ড হয়।
ফাঁসির মঞ্চে আরোহণের পূর্বে আগস্ট স্পিজ বলেছিলেন, ‘আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমারদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে।’২৬ জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্নর অভিযুক্ত আটজনকে নিরাপরাধ বলে ঘোষণা দেন এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশ কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক ৮ঘন্টা কাজ করার ‘ দাবি অফিসিয়ালি স্বীকৃতি পায়।
ব্রিটেনের হাউড পার্কে বিশাল সমারোহে উদযাপন করা হয় প্রথম
আন্তর্জাতিক মে দিবস।যুক্তরাষ্ট্রেও একই বছর মে দিবস পলন করা হয়েছে। ফ্রান্সে দিবসটি পালন করা হয় শ্রমিকদদের বিশাল মিছিলের মধ্যদদিয়ে। রাশিয়ায় প্রথম ১৮৯৬ সালে এবং চীনে ১৯২৪ সালে আন্তর্জাতিক মে দিবস পালিত হয়।
বাংলাদেশে মে দিবস পালন এবং শ্রমিকদের বাস্তবতা :-
দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং আইএলও কর্তৃক প্রণীত নীতিমালার স্বাক্ষরককারী একটি দেশ বাংলাদেশ। এই দেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা অনেক। শ্রমিক দিবসের প্রেরণা থেকে বাংদেশও পিছিয়ে নেই। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান শাসন থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে বিপুল আয়োজনের মধ্য দিয়ে মে দিবস পালিত হয়। আর ঐ বছরে মে দিবসে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়।এই ছুটি এখনো বহাল রয়েছে। প্রতি বছর মে দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা একদিকে যেমন তাদের আধিকার আদায়ের রক্তাক্ত ইতিহাসকে স্মরণ করে তেমনি স্বপ্ন দেখে তাদের অধিকারের ষোলআনা প্রাপ্তির। বর্তমানে শ্রসিকদের দিকে তাকালে মনে হয় তাদের প্রাপ্তি পরিপূর্ণ হয়নি। ২০১৩ সালেন ২৪ এপ্রিল
বাংলাদেশের ইতিহাসে সাভারে রানা প্লাজায় শ্রমিকদের ওপর স্মরণকালের ভয়াবহ ভবন ধসে প্রায় শতাধিক নিরীহ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো জাতিকে শোকাহত করে।
২০১০ সালে হামিম গার্মেন্টসসহ তিনটি গার্মেন্টসে অনেক শ্রমিকের প্রাণ চলে যায়। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে আশুলিয়া তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের গার্মেন্ট কারখানায় আগুন লেগে ১১১ জন শ্রমিক মারা যায়।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এর তথ্য অনুযায়ী ২০০১ সালে কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩০১ জন। ২০১১ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭৯ জনে। আর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে প্রায় এক হাজার ২৩৫ জন শ্রমিককে। ২০১২ সালের ছয় মাসের চিত্র আরো ভয়াবহ।
২০১২ এর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ছয়মাসে নিহত হয়েছেন ৭০৪ জন শ্রমিক। ২০১১ সালে পেশাগত দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় নিহত হন ৬৮৩ জন শ্রমিক। ২০১০ সালে ৭০৩ জন, ২০০৯ সালে ৩৭৮ জন, ২০০৮ সালে ৫৪৭ জন, ২০০৭ সালে নিহত হন ৪৬৫ জন, ২০০৬ সালে ৯৭৪ জন, ২০০৫ সালে ৪৮০ জন, ২০০৪ সালে ১৮৮ জন, ২০০৩ সালে ২৫১ জন এবং ২০০২ সালে ১৬৮ জন শ্রমিক।
২০১৫ সালে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারী মাসে নিহত হয়েছে ২৮৮ জন শ্রমিক।
২০১৭ সালে দেশে কর্মক্ষেত্রে দূর্ঘটনা ঘটেছে তিনশ’ ২১টি। আর এসব দূর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চারশ’ ২৬ জন শ্রমিক।
এতথ্য জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ‘সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি’।
এসব অধিকাংশঘটনা ঘটেছে মালিক শ্রেণীর গাফলতির কারণে। আজকের এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য বেতন পাচ্ছেনা।যেখানে শ্রমিক আন্দোলন হয়েছিল ৮ঘন্টা কর্মদিবসের জন্য।সেখানে বাংদেশের গার্মেন্টসগুলোতে এখনও ৮ঘন্টার পরিবর্তে ১২ঘন্টা কাজ করা হচ্ছে।
আমাদের দেশে এখন বেড়ে চলেছে শিশুশ্রম যা ধারা দূর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। কারণ শ্রমিকের শারিরীক অবস্থা বোঝে কাজ দেই না মালিকরা। তার মধ্যে শিশু শ্রমটি চোখে পড়ার মতো।অথচ সংবিধানে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ।
শ্রমিকদের জন্য জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সংগঠন হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের অধিকারসমুহ স্বীকৃতি লাভ করে। আইএলও শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ পর্যন্ত ১৮৩টি কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে বাংলাদেমকে।
বাংদেশ লেবার ফোর্সের জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৫কোটি।
শ্রমিকদের প্রতিটি ঘামের ফুটায় এই পৃথিবী বড় বড় দালন গুলো তাল গাছের মতো দাড়িয়ে আছে। সর্বোপরি মালিক পক্ষ শ্রমিকদের ৮ঘন্টা কাজের সময় যথাযত করে তাদের ন্যায্য বোঝিয়ে শ্রমিক অধিকার পরিপূর্ণ করবে।

মন্তব্য

মন্তব্য