চাইলে খালেদা জিয়াকে আগেই গ্রেপ্তার করতে পারতাম : প্রধানমন্ত্রী

দেশের স্বাধীনতাকে যারা ব্যর্থ করতে চায়, তারা যেন কোনো দিন এদেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে সকলের প্রতি সেই আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ সময় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘চাইলে খালেদা জিয়াকে আগেই গ্রেপ্তার করতে পারতাম।’
আজ মঙ্গলবার বিকেলে আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ সব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশ, স্বাধীনতা; লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে। এ দেশ জঙ্গিদের, স্বাধীনতাবিরোধীদের, যুদ্ধাপরাধীদের হবে না। এ দেশ হবে মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শের দেশ। সেইভাবেই আমরা দেশকে গড়তে চাই, এগিয়ে নিতে চাই।’সরকারি কোনো পদক্ষেপে নয়, আদালতের রায়েই বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জেল হয়েছে বলেও জানান শেখ হাসিনা। তিনি এসময় ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিজের গ্রেপ্তারের কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘ওই সময় কারা আমাকে গ্রেপ্তার করিয়েছে সেটা আমরা জানি। ওই হিসাব নিকাশ পরে নেবো।’
খালেদা জিয়ার উল্লেখ নাম না করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এতিমখানার জন্য টাকা এসেছিল ১৯৯১ সালে। এতিমদের একটা টাকাও না দিয়ে তাও আত্মসাৎ। এতিমের টাকা আত্মসাৎ করার পর মামলা হয়ে শাস্তি হয়েছে। কোর্ট শাস্তি দিয়েছে। আমরা কখনো কোনো পদক্ষেপ নিই নি। আমরা কিছু করি নি। আমাদের যদি গ্রেপ্তার করতে হতো, তাহলে অগ্নিসংযোগ শুরু করেছে, তখনি গ্রেপ্তার করতে পারতাম। কিন্তু আমরা তো তা করি নি।’প্রধানমন্ত্রী এর আগে ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের আগে আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের অগ্নিসংযোগের চিত্র তুলে ধরেন।
বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মামলা হয়েছে, কোর্টের রায়ও তারা মানে না। বিএনপি-জামায়াত আইন মানবে না, আদালত মানবে না, সংবিধান মানবে না। কিছুই মানবে না। তারা ক্ষমতায় থেকেও স্বেচ্ছাচারিতা করেছে। এখনো স্বেচ্ছাচারিতা করতে চায়। যেভাবে মানুষ হত্যা করেছে, এখনো সেই মানুষ হত্যাই করতে চায়। এটাই তাদের উদ্দেশ্য। দেশের উন্নয়নটা তারা চক্ষেই দেখে না। আর চোখ থাকতে অন্ধ হলে কারো কিছু করার নাই। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এটা আর্ন্তজাতিক স্বীকৃত।’পদ্মা সেতু নির্মাণে বাধাকে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এসময় নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘একটা ভদ্রলোক, বিশ্বের অনেক নামকরা পুরস্কার পেয়েও তার মন ভরে নাই। একটা ক্ষুদ্র ব্যাংকের এমডির পদ ছাড়ার লোভ সামাল দিতে পারে নাই। সেই এমডির পদের লোভে পড়ে আবার পদ্মা সেতু বন্ধের জন্য আমেরিকায় লবিং করে সেই টাকা বিশ্বব্যাংক থেকে বন্ধ করে দেয়। জাতির পিতা বলেছিলেন, কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আমিও সেটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। আমার বিরদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনতে চেয়েছিল। বহু চেষ্টা করেছে।’
বিএনপি ক্ষমতায় এসে বিশেষ এজেন্সি হায়ার করে আমার বিরুদ্ধে, আমার বোনের বিরুদ্ধে, আমার ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে। দুর্নীতি পায় কী না। আবার সেই এমডি সাহেবও তিনিও আমেরিকাকে দিয়ে তদন্ত করিয়েছেন, না পেয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকা বন্ধ করে আমাদের ওপর দোষারোপ করতে চেষ্টা করেছে দুর্নীতির। চ্যালেঞ্জ দিয়েছি প্রমাণ করো। প্রমাণ করতে পারে নাই। কানাডার আদালতে মামলা হয়েছিল। তারা বলে দিয়েছে এই সমস্ত অভিযোগ ভুয়া। একটা জিনিস মনে রাখবেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে পাঁচ বার চ্যাম্পিয়ন করেছে। আর আজকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে দুর্নীতি আমরা যে করি নাই, তার প্রমাণ শুধু মুখে বলা না, এটা আজকে আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উন্নয়নের লক্ষ্য হচ্ছে তৃণমূল পর্যায় থেকে উন্নত করা। কোনো ঘর অন্ধকার থাকবে না। সেই নীতি নিয়েই আমরা দেশ পরিচালনা করছি বলেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নইলে ১৯৭৫ এর পর যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা তো নিজেদের অনেক উচ্চমার্গের মনে করতো, আর তাদেরকে যারা সমর্থন করতে যেতে তারাও তো সেইভাবেই চিন্তা করতো। আর দেশের মানুষ কী পেয়েছিল। কিছুই না। তাদের খাতায় সবই শূন্য। মুষ্টিমেয় লোক সম্পদশালী হয়েছে। সেই জিয়ার আমল থেকে খেলাপি ঋণের ব্যবসা। জিয়ার আমল থেকেই দুর্নীতি। যা ধারাবাহিকভাবে জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া যখনি যে এসেছে ওই দুর্নীতি করা; নিজেদের সম্পদক গড়া, নিজেদের সাজুগুজু, নিজেদের ভোগবিলাস এই নিয়েই ব্যস্ত। দেশের মানুষের দিকে তারা ফিরে তাকায় নি। আর আমাদের চিন্তাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ আমার বাবা শিক্ষা দিয়ে গেছেন।’

বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘যখনি দেশটা একটু উন্নত হয়, তখনি তার কথা মনে হয়। জানি না তিনি বেহেশতে থেকে নিশ্চই দেখেন। নিশ্চয় তিনি এদেশের মানুষের কথা ভাবেন। নইলে আমি ভাবি, আমার কী যোগ্যতা আছে, কী ক্ষমতা আছে একটা রাষ্ট্র পরিচালনা করার, এতো উন্নতি করার। নিশ্চয় তিনি বেহেশত থেকে এদেশের মানুষের ওপর নজর রাখেন বলেই আজকে কাজ করার সুযোগ পাই। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমি যদি আমার আব্বাকে বলতে পারতাম। আপনার দেশের মানুষের জন্য এইটুকু কাজ করতে পেরেছি।’
আজকে একটা মানুষও কুঁড়েঘরে থাকে না। মানুষের অন্তত মাথাগোঁজার ঠাঁই করে দিতে পেরেছি। আমরা আরও করতে চাই। আজকে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে সন্মান পেয়েছি। বাবাকে যদি বলতে পারতাম, তাহলে হয়তো শান্তি পেতাম। আমরা দুই বোন যখন একসাথে হই, আমরা বলি, আমার মনে হয়, আমার আব্বা-আম্মা হয়তো জানতে পারেন, শুনতে পারেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সবসময় বলে এসেছি, স্বাধীনতার সুফল বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে আমরা পৌছে দিব। অর্থসম্পদ চিরদিন থাকে না, কেউ কবরে নিয়ে যেতেও পারে না। সম্পদের জন্য মারামারি, কাটাকাটি করে। মরে গেলে সবই পড়ে থাকে। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া একজন রাজনীতিবিদের সেটাই কর্তব্য।’
আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর একে একে দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়েছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে অত্যাচার নির্যাতন করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে। এরপর আসলো জরুরী অবস্থার সরকার। সেখনেও কিন্তু সবার আগে আমাকে গ্রেপ্তার করলো। আমি তো ক্ষমতায়ও ছিলাম না। কারা করিয়েছে সেটা আমরা অন্তত এখন জানি। ওই হিসাব নিকাশ পরে নেবো আমরা।’

আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ডা. রোকেয়া সুলতানা, এ কে এম এনামুল হক শামীম, এস এম কামাল হোসেন, এ কে এম রহমউল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য দেন।

আওয়ামী লীগের নেতারা ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) ড. হারুনুর রশিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম আলোচনায় অংশ নেন।
যৌথভাবে সভা পরিচালনা করেন ড. হাছান মাহমুদ ও আমিনুল ইসলাম আমিন। রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এই সভায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

মন্তব্য

মন্তব্য