প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনা বলেছেন ক্ষমতায় থেকে অত্যাচার-নির্যাতন করেছে বিএনপি সরকার।

এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্যাতনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনা বলেছেন, তখন ক্ষমতায় থেকে অত্যাচার-নির্যাতন করেছে বিএনপি সরকার। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর প্রথম গ্রেফতার করা হলো আমাকে। আমি তো সরকারে ছিলাম না। কারা এ কাজ করেছে, তা অন্তত এখন আমি জানি। তাদের হিসাব-নিকাশ পরে করব। গতকাল বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

৪৯ মিনিটের বক্তৃতায় শেখ হাসিনা দেশ গঠনে জাতির জনকের ভূমিকাসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে কী ষড়যন্ত্র হয়েছে তার উল্লেখ করেন। এর সূত্র ধরেই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে গ্রেফতারের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। কারও নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা ভদ্রলোক, বিশ্বের অনেক নামকরা প্রাইজ পেয়েও তার মন ভরেনি। ক্ষুদ্র একটি ব্যাংকের এমডি পদের লোভে পদ্মা সেতু বন্ধ করার জন্য আমেরিকায় লবিং করে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে টাকা বন্ধ করে দেন। আমি আগেই বলেছি, জাতির পিতা বলেছেন, কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা বাঙালি, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা। আমিও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এজেন্সি হায়ার করে এনে আমার বিরুদ্ধে, আমার বোনের বিরুদ্ধে এবং আমার ছেলের বিরুদ্ধে তদন্ত করানো হয়েছিল কোনো দুর্নীতি পায় কিনা। কিন্তু পায়নি। সেই এমডি সাহেবও আমেরিকাকে দিয়ে তদন্ত করিয়েছেন। দুর্নীতি না পেয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে দিয়ে পদ্মা সেতুর টাকা বন্ধ করিয়েছেন। কানাডার ফেডারেল কোর্টে মামলা হয়েছিল। কিন্তু মামলায় দুর্নীতির প্রমাণ পায়নি। অভিযোগটি ছিল ভুয়া। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল, দেশ পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, আমরা যে দুর্নীতি করিনি, তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ যাতে ক্ষমতায় না আসতে পারে তার জন্য ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। তিনি বলেন, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ব্যর্থ হতে দেব না। আর যারা স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করতে চায় তারা যেন আর কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য দেশবাসীকে সজাগ থাকতে হবে। এই দেশ জঙ্গিদের হবে না। এই দেশ স্বাধীনতাবিরোধীদের হবে না। এই দেশ যুদ্ধাপরাধীদের হবে না। এই দেশ হবে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশ। সেই দেশ হিসেবেই আমি গড়ে তুলতে চাই। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ের বিবরণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, তারা বাংলা ভাই সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের দেশে পরিণত করেছে। গ্রেনেড হামলা তো আছেই। এইভাবে অত্যাচার করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল তারা। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছি। এরপর ২০১৩ সালে তারা (বিএনপি) এক দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি করে। সেই অবস্থা আমরা সামাল দিয়েছি। ২০১৪ সালে আবার নির্বাচন হয়। মানুষের ভোটে ক্ষমতায় আসি। কিন্তু তারা ২০১৫ সালে অগ্নিসন্ত্রাস করে। সাড়ে ৩ হাজার মানুষ পুড়িয়েছে। হাজার হাজার গাড়ি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। সরকারি অফিসে আগুন দিয়েছে। তিনি বলেন, কেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো— এটাই তাদের অন্তর্জ্বালা। তারা তো ক্ষমতায় থেকে ভোগবিলাস করেছে। মানি লন্ডারিং করে ধরা পড়েছে। এতিমখানার টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করেছে। এতে আমাদের কোনো হাত নেই। কিন্তু আদালত তাদের সাজা দিলে তারা মানে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় আসার পর দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে রূপ দেন। এর ৪৩ বছর পর আজ দেশ উন্নয়নশীল হয়েছে। আমরা জনগণের কল্যাণে কাজ করেছি। আমরা বাজেট বাড়িয়েছি, দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় বাড়িয়েছি। এ সময় বিএনপি জোটের ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৫-০৬ অর্থবছরের বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের মেয়াদের একই খাতের বিভিন্ন তথ্যের তুলনা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করতে যাচ্ছে। এই স্যাটেলাইটের পর পর্যায়ক্রমে আরও স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করা হবে। আমরা মেট্রোরেল নির্মাণ করছি। আমরা ফ্লাইওভার তৈরি করেছি। হাইওয়েগুলো চার লেন করে দিচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ উন্নত জীবন পাক, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। অর্থসম্পদ চিরদিন থাকে না। কেউ কবরেও নিয়েও যেতে পারে না। তিনি বলেন, মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া একজন রাজনীতিবিদের কাজ। জাতির পিতার সন্তান হিসেবে আমি সেটাই করতে চাই। নিজেদের সম্পদ গড়তে আসিনি।

আলোচনা সভায় আরও বক্তৃতা করেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-উর রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণালকান্তি দাস, সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা, কেন্দ্রীয় সদস্য এস এম কামাল হোসেন, ঢাকা মহানগরী উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ। দলের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদের পরিচালনায় আলোচনা সভায় সূচনা বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

মন্তব্য

মন্তব্য