তেঁতুলিয়ায় মাটি খুরলেই মিলে কাঠের খনি

মুহম্মদ তরিকুল ইসলাম, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধিঃ পঞ্চগড় জেলাধীন তেঁতুলিয়া উপজেলায় মাটির নিচে কাঠের খনি! কথাটি শুনে একটু অবাক লাগলেও বাস্তব। মাটি খনন করলেই মিলছে কাঠ। বাংলাদেশের সর্বউত্তরের প্রান্তিক জেলা পঞ্চগড়ে ১০ থেকে ২০ ফিট মাটি খনন করলেই মাটির নিচে মিলছে পুরনো দিনের গাছ বা কাঠ। কাঠ গুলো দেখতে শাল কাঠের মত তাই এলাকাবাসির ধারনা এগুলো শাল কাঠ। পঞ্চগড় জেলা যেমন পাথরের জন্য বিক্ষাত তেমনি মাটির নিচে চাঁপা পড়ে থাকা এসব কাঠ এতই পরিমানে পাওয়া যাচ্ছে যে পাথরের পাশাপাশি বলা যেতে পারে কাঠের খনি। পাথরের জন্য পঞ্চগড় বিক্ষাত হওয়ায় এখানকার জনসাধারনের বিরাট একটি অংশ পাথর ব্যবসার সাথে জরিত। তারা তাদের নির্ধারিত স্থানে মাটি খনন করে পাথর উত্তোলন করতে গেলে পাথরের সাথে এসমস্ত গাছ মিলছে। গত ৪০ বছর ধরে পাথর উত্তোলনের জন্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাটি খনন করলেই বেরিয়ে আসছে এ সব গোটা গাছ। ৪০ বছর আগে এই এলাকায় মাটি খনন করে পাথর উত্তলনের নিয়ম চালু ছিলনা। এ সব গাছ স্থানীয়রা ঘর-বাড়ি, আসবার পত্র বানানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার গাছ ব্যবসায়ীদের কাছে বিত্রি করে আসছে। তবে তাদের দাবি পুরনো এসব গাছ নতুন গাছের তুলনায় অনেক বেশি মজবুত। তারা আরো জানায়, এ সমস্ত গাছ কখনো কখনো এত বড় পাওয়া যায় যে সোমিলে কাটলে ২ থেকে ৪’শ সেপ্টি কাঠ পাওয়া য়ায়। স্থানীয়দের ধারণা, প্রায় হাজার হাজার বছর আগে হযরত নূহ (আঃ) এর সময় এই অঞ্চলে পরিবেশ ধ্বংস, ভয়াবহ ভুমিকম্পসহ বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এ সব গাছ মাটির নিচে চাপা পড়ে। তবে এর সঠিক ইতিহাস কোন স্থানীয়র জানা নেই। প্রতিবছর এ সব গাছ উত্তোলন কে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের পক্ষে গাছ মহল হিসেবে সরকারি ভাবে ইজারা দেয়া হয়। সরেজমিনে এসব গাছ দেখতে গেলে তেঁতুলিয়া উপজেলার পাথর ব্যবসায়ী কালাম জানান, আমরা গাছের জন্য মাটি খনন করি না। আমাদের মূল উদ্দেশ্য পাথর উত্তোলন। পাথরের পাশাপাশি মিলছে এসব গাছ। অপরদিকে পাথর ব্যবসায়ী সালাম জানান, মাটি খনন করে এসব গাছ পাওয়া গেলেও তা উপরে তুলতে ৫০ থেকে ১’শ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। এতে আমাদের পাথর উত্তোলনে বেঘাত সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৮৯৭ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা হতে সিলেটের ব্রম্যপুত্র নদী ও ভারতের একাংশ ভুমি সমস্থ দেবে যায়। উল্লেখ্য, ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ঢাকা থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে ডাউকি নদীর তলদেশে ৮.৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এতে হাজার হাজার মানুষ, লাখ লাখ পশুপাখিসহ প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। এর পর বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলে ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত আনে। আবার ১৯৩৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিহারসহ উত্তরের পঞ্চগড়সহ বেশ কয়েকটি জেলায় ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ১৫ আগষ্ট আসামে সংঘটিত ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর বিগত ৬৭ বছরে বাংলাদেশ ও এর আশপাশে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প আর হয়নি। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে আসাম-তিব্বতের ৭০টি গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, এ পর্যন্ত সংঘটিত ১৮৩৩, ১৮৮৫, ১৮৯৭, ১৯০৫, ১৯৩০, ১৯৩৪, ১৯৪৭ ও ১৯৫০ সালের বড় ধরনের ৮টি ভূমিকম্প হয়। এর পর ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল শনিবার বেলা ১১ টা ৫৬ মিনিটে ৭.৮ মাত্রায় নেপালে সবচেয়ে প্রলয়ংকারী ভূমিকম্প হয়। এই ভূমিকম্পে প্রায় ৯হাজার লোকের প্রাণহানী ঘটে এবং আহত হয় প্রায় ২২হাজার। সে সময় বাংলাদেশেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। কেনো কোন বিশেষজ্ঞদের মত ১৫৫৬ সালর ২৩ জানুয়ারির দিনটি ইতিহাসের পাতায় লেখা রয়েছে এক কালো অধ্যায় হিসেবে। ভূমিকম্পে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছিল এই দিনে। চীনে ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের ফলে এর কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫’শ কিলোমিটার পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। কোনো কোনো জায়গার মাটি ভাগ হয়ে ঘর-বাড়ি নিচে চাপা পড়েছিল। কোথাও মাটি উত্থিত হয়েছিল আবার কোথাও বা মাটি ধ্বসে গিয়েছিল। এই ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা যায়। সে সময় হিমালয় ধসে পঞ্চগড়ের এই অঞ্চল ঢেকে যায়। এবং এ অঞ্চলের সব কিছু মাটির নিচে দেবে যায়। আর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে চীনের দুরত্ব মাত্র ২ শত কিঃ মিঃ। পঞ্চগড় সহকারি মহিলা কলেজের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক পরিবেশবিদ মো. তহিদুল বারী (বাবু) জানান, ১৮৯৭ সালের যে ভূমিকম্পটি হয়েছিল সেই ভূমিকম্পে নাম দেয়া হয়েছিল ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্কোয়াক’। ভয়াবহ ভূ-কম্পনটির উৎসস্থল ছিল সিলেট জেলার পূর্ব সীমান্তবর্তী ভারতে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৮.৬। ভূমিকম্পটির উৎসস্থল থেকে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছিল। এই ভূমিকম্পের কারণে ব্রক্ষপুত্র নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে পঞ্চগড় সহ সিলেট ও আসাম অঞ্চলের উল্লেখ্যযোগ্য ভৌগলিক পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের উত্তর পুর্ব অঞ্চলের পুরো অংশ টুকু বেলা বনভূমি দিয়ে অবৃত্ত ছিল এবং সেই বনভূমিটি সমস্ত দেবে যায়। আর এই কারনে পঞ্চগড়ে বিশ্রিত অঞ্চল জুরে মাটির নিচে পাথরের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ পাওয়া যায়।

মন্তব্য

মন্তব্য