গলাচিপার নদীগুলোতে অসংখ্য ডুবোচর নৌ চলাচল হুমকির মুখে

রিপন বিশ্বাস,গলাচিপা(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি
পটুয়াখালী জেলার উপকূলীয় গলাচিপায় জালের মতো বিস্তত প্রায় অর্ধশত নদ-নদী রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি নজরদারি ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেখা দিয়েছে অস্তিত্ব সঙ্কট। এদিকে উপকূলীয় গলাচিপার বিভিন্ন নদীতে নাব্যতা সঙ্কটও এখন তীব্র আকার নিয়েছে। নদ-নদীগুলোতে অসংখ্য ডুবোচর জন্ম নেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। চর কাজল এলাকার জিনতলা চ্যানেলটি পলিমাটি জমে ইতিমধ্যেই সিলড হয়ে গেছে। কাউখালী বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর অপর চ্যানেলটিও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে গলাচিপা-চরমোন্তাজ ও উলানিয়া-চরমোন্তাজ রুটে নৌ চলাচল পুরোপুরি অচল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যান্য রুটেও কমবেশি নাব্যতা বিরাজ করলেও বাঁশের লগির সাহায্যে পানি মেপে মেপে নদী অতিক্রম করছে ট্রলার বা লঞ্চ চালকরা। এর ফলে মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচল। নৌ পথে যাতায়েতকারী লঞ্চ ও ট্রলারের যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে নানা দুর্ভোগ। এ সমস্যা সমাধানে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নেই বলে সংশিষ্ট একাধিক লঞ্চ চালকরা জানান। উপজেলার সর্বত্র যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে নৌপথ। উপজেলা সদরের সঙ্গে ইউনিয়ন ও গ্রামগুলোর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আজও গড়ে ওঠেনি। গলাচিপা উপজেলায় ১২টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও রাঙ্গাবালী উপজেলায় ৫টি ইউনিয়নে সাড়ে ৫ লাখ লোক বসবাস করে। এর মধ্যে গলাচিপা উপজেলার ২টি ও রাঙ্গাবালী উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন মূল ভূখন্ড থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। বিচ্ছিন্ন এসব ইউনিয়নের আওতায় চর রয়েছে শতাধিক। এর অর্ধশতাধিক চরে গত চার/পাচঁ দশক ধরে মানব বসতি গড়ে উঠেছে। এসব চরে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ট্রলার অথবা নৌকা। দুর্গম এসকল চরে জরুরী প্রয়োজন বা হঠাৎ করে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ট্রলারের জন্য অপেক্ষা করতে হয় পরের দিন পর্যন্ত। শুধু দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনন্যোপায় হয়ে সময়ক্ষেপনে অনেক রোগীর মৃত্যুবরণ করতে হয়। এদিকে বিভিন্ন নদীতে যত্রতত্র অব্যাহতভাবে অসংখ্য চর জেগে ওঠায় সৃষ্টি হয়েছে নাব্যতা সঙ্কট। ফলে নৌযোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে চর জেগে ওঠার কারণে নদীর স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভাঙছে লোকালয়, জনপথ। চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে জমি, বাড়ি, বাগান, বাজার ও পুকুরসহ সহায়-সম্পদ। এসব সম্পদ হারিয়ে অনেক পরিবার চিরতরে উদ্বাস্তুতে পরিনত হয়েছে। অথচ নদীর স্রোতের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা হলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেত অনেক মানুষ। ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যেত অনেক সহায়-সম্পদ। এ অভিমত এলাকার ভূক্তভোগী মানুষের। উপজেলার বুড়াগৌরাঙ্গ, দাড়ছিড়া, রামনাবাদ, আগুমুখা, ডিগ্রিসহ সব নদী ও মোহনায় সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ডুবোচর। প্রমত্তা ডিগ্রি নদীর মাঝখানে বিশাল ডুবোচর জেগে ওঠায় গলাচিপা-রাঙ্গাবালী নৌ-চলাচল হুমকির মধ্যে পড়েছে। এককালের রুদ্র রুপী আগুনমুখা নদী কালের আবর্তনে মৃত প্রায় নদীতে পরিনত হয়েছে। সাতটি নদীর মিলন স্থলে বর্তমানে বিরাজ করছে বিশাল চর ও বনভূমি। ইতিহাসখ্যাত সেই আগুনমুখার প্রমত্তা এখন আর নেই। নদীর মাঝ বরাবর ছোট্ট একটি চ্যানেল দিয়ে কোনো মতে চলাচল করছে লঞ্চ ও ট্রলার। এ চ্যানেল দিয়ে শুধু জোয়ারের সময় নৌযান চলাচল করতে পারে। ভাটির সময় নাব্যতা সঙ্কটের কারণে এ চ্যানেল দিয়ে লঞ্চ-ট্রলার কিছুই চলাচল করতে পারে না । অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী জোয়ারের জন্য। গত কয়েক বছরে বুড়াগোরাঙ্গ নদীর চরকাজল সংলগ্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। এতে নৌ যোগাযোগ প্রচন্ড ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ আজ পর্যন্ত এসব ডুবো চরের সীমানা চিহ্নিত করার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ কারণে প্রায় সময়ই নৌযানগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন চরে আটকে থাকে। এর ফলে যাত্রীদের পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। একদিকে নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় নদীগুলোতে ডুবো চরের সৃষ্টি অন্যদিকে মারত্মক নাব্য সঙ্কটের কারণে নৌ চলাচলসহ ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি নির্ভর গলাচিপা-রাঙ্গাবালী উপজেলার উপকূলীয় চরাঞ্চলের সাধারণ পরিবারগুলোর জীবন জীবীকার ওপর। রাঙ্গবালী-পানপট্টি রুটের এম এল পানপট্টি-২ লঞ্চের মাষ্টার বোরহান জানান, ডিগ্রি নদীর মাঝখানে চর পড়ার কারণে পানপট্টি থেকে কোড়ালিয়া যেতে প্রায় ৬ কিলোমিটার পথ বেশী যেতে হয়। এছাড়া ভাটির সময় ডুবোচরে লঞ্চ আটকে যায়। গলাচিপা-চরমোন্তাজ রুটের ট্রলার মালিক সোহরাব হোসেন ডাক্তার জানান, ডুব চরের কারণে প্রায়ই ট্রলার আটকে গিয়ে দুর্ঘটানার স্বীকার হয়। এব্যপারে পটুয়াখালী বিআইডব্লিউটিএ এর পোর্ট অফিসার আ.রাজ্জাক জানান, পায়রা সমুদ্র বন্দরের সাথে ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-চাদঁপুরের সাথে নৌরুট সচল রাখতে ডিগ্রি ও বুড়াগৌরঙ্গ নদীতে ড্রেজিং চলছে। তাছাড়া কিছু দিনের মধ্যেই বুড়াগৌরঙ্গ নদীর বন্যাতলী-চরশিবা ফেরি চালু করতে বুড়া গৌরাঙ্গ নদী উত্তর অংশে ডেজিং শুরু হলে প্রায় সকল নৌরুট সচল হবে। এছাড়া ওই এলাকা গুলোতে নৌপথ সচল রাখতে ইতিমধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে নদী খননের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

মন্তব্য

মন্তব্য