ইউনেসকোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রথম অলিখিত ভাষণ

যুদ্ধ ও সামাজিক বিপর্যয় এবং সংরক্ষণের অভাবে বিশ্বজুড়ে ঝুঁকিতে থাকা নথিগুলোকে ২০ বছর ধরে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে ইউনেসকো। এ পর্যন্ত এসব স্বীকৃতির মধ্যে সংস্থাটি এবারই এমন কোনো ভাষণকে স্বীকৃতি দিল, যা ছিল অলিখিত। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার
ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ভাষণ দেন, যা বাঙালিকে স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
বিশ্বের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকো। এগুলোর পাশাপাশি সংস্থাটি ১৯৯৭ সাল থেকে প্রামাণ্য ঐতিহ্যগুলোকেও স্বীকৃতি দেওয়া শুরু করে। এ জন্য ১৯৯২ সালে সংস্থাটি মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এমওডব্লিউ) কর্মসূচি চালু করে। ইউনেসকো মনে করে, যুদ্ধ ও সামাজিক বিপর্যয় ছাড়াও বিশ্বজুড়ে লুট, অবৈধ বাণিজ্য, বিনাশ, সংরক্ষণের অপর্যাপ্ত উদ্যোগ ও অর্থায়নের অভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি।

এমওডব্লিউ কর্মসূচির আওতায় ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪২৭টি দলিলকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেসকো। এর মধ্যে রয়েছে পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি, বই, মানচিত্র, বিভিন্ন প্রাচীন রাজবংশ, ধর্মীয়, আর্কাইভ ও গ্রন্থাগার এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলিসংশ্লিষ্ট নথি। রয়েছে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনসংশ্লিষ্ট নথি।

২০১৫ সাল পর্যন্ত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নথিগুলোর মধ্যে বার্লিন প্রাচীর নির্মাণ ও ভেঙে ফেলা এবং ১৯৯০ সালের চুক্তির দলিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় রাষ্ট্র বনাম নেলসন ম্যান্ডেলা ও অন্যান্য মামলার নথি, আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি, চে গুয়েভারার জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণিক সংগ্রহ, জিন্নাহ পেপারস, ঋগ্বেদ, চার্চিল পেপারস অন্যতম।

ইউনেসকোর মতে, দুই জার্মানিকে বিভক্তকারী বার্লিন প্রাচীর নির্মাণ ও তা ভেঙে ফেলা এবং ১৯৯০ সালের চুক্তি জার্মানির একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্য। এ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জার্মানি, ইউরোপ এবং পুরো বিশ্বের জন্যই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল এটি। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির স্মৃতিও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চার মিত্রশক্তি ফ্রান্স, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির আলোচনার ভিত্তিতে ১৯৯০ সালে একটি চুক্তি হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই জার্মানি আবারও এক হয়ে সার্বভৌম জার্মানি গঠন করে। ২০১১ সালে এ-সংক্রান্ত নথিগুলোকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো।

১৯৬০ সালে নিষিদ্ধঘোষিত আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) ও প্যান আফ্রিকানিস্ট কংগ্রেসের (পিএসি) নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের জন্য বিশেষ আইনের ব্যবহার করে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই মামলার পরই নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর দল এএনসির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছিলেন। মামলাটির জেরে ম্যান্ডেলা ও তাঁর সহযোগী অন্য নেতাদের রোবেন দ্বীপে কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯৯০ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান তাঁরা। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে এই মামলার নথিগুলোকে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আনা ফ্রাঙ্ক ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের অবরুদ্ধ দিনগুলোর কথা উঠে এসেছে তাঁর দিনলিপিতে। বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে পঠিত ১০টি বইয়ের মধ্যে এই দিনলিপি একটি। ২০০৯ সালে ইউনেসকো এই ডায়েরিকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।

আর্নেস্তো চে গুয়েভারার জীবন ও কর্মের যে নথিগুলোকে ইউনেসকো বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে, তাতে ৮ হাজার ১৯৭ পৃষ্ঠা রয়েছে। এতে ১৯২৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত চের বিপ্লবী কার্যক্রম, বিভিন্ন রচনা, সংবাদ, জীবনচরিতমূলক নথি ও ব্যক্তিগত কাজের নথি রয়েছে। এই নথিগুলোর মধ্যে ৪৩১টিই চের নিজের রচিত, বাকি ৫৬৭টি নথি চের সম্পর্কিত। বলিভিয়া ও কিউবার প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০১৩ সালে এসব নথির স্বীকৃতি আসে।

দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে জিন্নাহ পেপারসে। পাকিস্তানের এই প্রতিষ্ঠাতার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি এই অঞ্চলে মুসলমানদের স্বাধীনতার আন্দোলনের ইতিহাসও রয়েছে এতে। পাকিস্তানের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো এসব নথিকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

ঋগ্বেদ হলো চার বেদের মধ্যে প্রাচীনতম। আর্যদের সময় এ গ্রন্থ রচিত হয়। ভারতের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে এ গ্রন্থ বিশ্ব প্রামাণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও সাহিত্য সম্পর্কিত চিঠিপত্র, নথি এবং ১৯৪০ সালের ১৮ জুন দেওয়া তাঁর বিখ্যাত ভাষণের সারবস্তুগুলো নিয়েই চার্চিল পেপারস। যুক্তরাজ্যের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে ইউনেসকো এসব নথিকে স্বীকৃতি দেয়।

প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যকে তালিকায় যুক্ত করে ইউনেসকো। এবার যোগ হয়েছে ৭৮টি নথি। এগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ একটি। এর অনন্য দিক হলো, ইউনেসকোর এটাই প্রথম স্বীকৃত ভাষণ, যা আগে থেকে লিপিবদ্ধ ছিল না।

এবারের প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে আরও রয়েছে চীনের হাড়লিপি, ভারত মহাসাগরে সুনামির নথি, জাতিসংঘে ১৯৮২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আদিবাসীদের বক্তব্য, গুটিবসন্ত নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রমের নথি, ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের জীবনীসংক্রান্ত নথি, গিলগিট পাণ্ডুলিপি এবং চেরনোবিল দুর্ঘটনার নথিপত্র।
চীনের হেনান প্রদেশে ইনসু এলাকায় হাড়ে লিখিত বাণীগুলো খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে লেখা হয় বলে ধারণা করা হয়। চীনা সাহিত্যের প্রথম দিককার নথিগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি।
পাকিস্তানের গিলগিটে ১৯৩১ সালে প্রাচীন গিলগিট পাণ্ডুলিপির সন্ধান মেলে। এতে বৌদ্ধধর্মসংশ্লিষ্ট বহু লেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে এই ধর্মের বিখ্যাত চার সূত্র অন্যতম। সারদা লিপিতে এই নথিগুলো লেখা হয়েছিল, যাতে লোককাহিনি, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্রসহ জীবন ও সাধারণ জ্ঞানের বহু তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেন অংশে অবস্থিত চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্রে ১৯৮৬ সালের ১৬ এপ্রিলের দুর্ঘটনায় ৩১ জন নিহত হয়। পরে তেজস্ক্রিয়তার কারণে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আরও ১৪ জন মারা যায়। এ-সংক্রান্ত নথিকেই এবার বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিল ইউনেসকো।

মন্তব্য

মন্তব্য