‘ঘরে-বাইরে’ ছিল সোনিয়ার বিরোধিতা

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনীমূলক সিরিজের তৃতীয় খণ্ড দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস (১৯৯৬-২০১২) ভারতের সীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলেরও মনোযোগ কেড়েছে। এর আগে তিনি লিখেছেন দ্য ড্রামাটিক ডিকেড: দ্য ইন্দিরা গান্ধী ইয়ারস ও দ্য টারবুলেন্ট ইয়ারস। তিনটি বইয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ইন্দিরা গান্ধী পরিবার এবং ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে।
প্রণব মুখার্জি লিখেছেন, সঞ্জয়ের মৃত্যুর (২৩ জুন ১৯৮০) পর ইন্দিরা গান্ধী মানেকাকে বলেছিলেন, ‘মরদেহ যখন ট্রাকে করে হাসপাতাল থেকে ১ আকবর রোডে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন যেন তিনি (মানেকা) তঁার পাশে থাকেন। হয়তো তিনি এই চিন্তা থেকে এ কথা বলেছিলেন যে মানেকাই হবে সঞ্জয়ের যোগ্য উত্তরসূরি। কিন্তু ইন্দিরা এই চিন্তা পরিত্যাগ করেন, যখন রাজীব ইতালি থেকে ফিরে এলেন। তঁার উক্তি ছিল, ‘তুমি আমার জন্য একাই রইলে।’

যখন রাজীবকে সঞ্জয়ের জায়গাটি নিতে ও রাজনীতিতে আসতে বলা হলো, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি রাজনীতির লোক নই। কিন্তু তিনি মায়ের আহ্বান নাকচ করতে পারেননি। এরপর কংগ্রেসের ৭০ জন সদস্যের স্বাক্ষরসহ একটি প্রস্তাবে রাজীবকে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। ইন্দিরা সিদ্ধান্তের বিষয়টি রাজীবের ওপর ছেড়ে দিলে তিনি বলেন, ‘মা যদি আমার সহায়তা চান, আমি রাজনীতিতে আসব। তিনি তখন ছিলেন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের পাইলট।’
এর আগের একটি ঘটনা।

ভারতে বাজেট অধিবেশন বসে ফেব্রুয়ারিতে। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে ভেঙ্কটরমনকে সরিয়ে প্রণব মুখার্জিকে অর্থমন্ত্রী পদে বসানো হয়। ইন্দিরা গান্ধী তঁাকে জিজ্ঞেস করেন, এত কম সময়ে তিনি বাজেট তৈরি করে সংসদে উপস্থাপন করতে পারবেন কি না। জবাবে প্রণব বললেন, ‘আমি চেষ্টা করব।’
এরই মধ্যে জানুয়ারি শেষে অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি আলভিন টোফলারসের প্রিভিউ অ্যান্ড প্রিমিজেস বইটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান, যাতে নিক্সনের সঙ্গে তঁার (ইন্দিরার) বৈঠকের উল্লেখ ছিল।

কয়েক দিন পর প্রধানমন্ত্রী বইটি ফেরত দিলেন, সঙ্গে একটি চিরকুটও ছিল।
‘ধন্যবাদ তোমাকে। আমি বইটি একবার উল্টেপাল্টে দেখেছি। আমি বিস্মিত হয়েছি যে আমার অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রণয়নের সময় টোফলার পড়ার সময় পান।’ প্রণব মুখার্জি তঁার জীবনের প্রথম বাজেট সংসদে পেশ করেন ১৯৮০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি।
এই ঘটনা থেকে প্রণবের পড়াশোনার ব্যাপ্তি বোঝা যায়। ভারতের রাজনৈতিক মহলে তিনি জীবন্ত অভিধান হিসেবে পরিচিত। অর্থনীতির জটিল সব তথ্য ও পরিসংখ্যান তঁার মুখস্থ। সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়াচুরি বলেছেন, প্রণবের স্মরণশক্তি হাতির সঙ্গে তুলনা করা যায়। হাতি কোনো কিছু ভোলে না।

আস্থা–অনাস্থার দোলাচলে
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর শিখ দেহরক্ষীর হাতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। একই দিন তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে চারজনের নামসংবলিত একটি তালিকা পাঠিয়ে বলেন, তঁার শপথ নেওয়ার পর তঁারা মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন। প্রণবসহ এই তালিকায় উল্লেখিত চারজনের তিনজনই রাজীবের মন্ত্রিসভায় ঠঁাই পাননি।
প্রণব পরে এর কারণ অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি উদ্দশ্যমূলকভাবে এই প্রচার চালিয়েছে যে প্রণব অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। ফলে রাজীবের সঙ্গে তঁার দূরত্ব তৈরি হয়। পরে রাজীব তঁাকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব দিলে প্রণব সানন্দে গ্রহণ করেন। বহু উপদলে বিভক্ত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেসকে গোছানোর কাজও তিনি শুরু করেন। এর মধ্যে প্রণব ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে একটি সাক্ষাৎকার দেন, যার শিরোনাম ছিল, ‘দ্য ম্যান হু নিউ টু মাস: প্রণব মুখার্জি ব্রেকস হিজ সাইলেন্স, ফাইনালি!’
এই সাক্ষাৎকারই তঁার জন্য কাল হয়ে দঁাড়ায়। তিনি কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হন।
দুবছর পর ১৯৮৮ সালে প্রণব কংগ্রেসে ফিরলেও রাজীব তঁাকে পুরোপুরি আস্থায় নিতে পারেননি।

রাজনীতি ছাড়িয়ে ইন্দিরা গান্ধী পরিবারের সঙ্গে প্রণব মুখার্জির হার্দিক সম্পর্ক ছিল। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন ইন্দিরা, তঁার দুই পুত্র রাজীব ও সঞ্জয়কে। দেখেছেন রাজীব-পত্নী সোনিয়াকেও। কিন্তু এই সম্পর্ক পুরোপুরি যে আস্থা-বিশ্বাসের ছিল, তা বলা যাবে না। অন্তত রাজীব গান্ধী তঁাকে একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন। তিনি প্রণবকে মন্ত্রিসভায় নেননি। এরপর প্রথম কোয়ালিশন সরকারে সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন মনমোহন সিংকে। যদিও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা প্রণবেরই বেশি ছিল। তখন প্রণব ভেবেছিলেন, দ্বিতীয় কোয়ালিশনে হয়তো তঁাকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে। কিন্তু দ্বিতীয়বারও মনমোহন প্রধানমন্ত্রী হলেন। আর সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে প্রণবের ভাগ্যে জুটল নির্বাহী ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতি পদ। এসব সত্ত্বেও প্রণব বরাবরই গান্ধী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং আছেন।

তখনো প্রস্তুত নন সোনিয়া
১৯৯১ সালের ২০ মে রাজীব গান্ধী আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। তিনি তখন লোকসভা নির্বাচনের প্রচারকাজে তামিলনাড়ু সফর করছিলেন। চেন্নাইয়ের কাছে শ্রীপুরুমবুদুরে তঁার জনসভা ছিল। সেখানে পেঁৗছাতেই এলটিটিআইয়ের কিছু সমর্থক রাজীবের গলায় ফুলের মালা দেওয়ার নামে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। প্রণব লিখেছেন, ‘বিশ্ব ইতিহাসে এ রকম ঘটনা বিরল, একই পরিবারের দুই সদস্য—মা ও পুত্র সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন।’
রাজীবের মৃত্যুর পর কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটি তঁার স্ত্রী সোনিয়া গান্ধীকে দলের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু সোনিয়া সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে তিনি বাইরের জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন।

উল্লেখ্য, রাজীবের রাজনীতিতে আসারও বিরোধী ছিলেন সোনিয়া। এ নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তঁার মনোমালিন্যও হয়। প্রণবের বই থেকে আমরা জানতে পারি, রাজনীতিতে আসার বিরোধী ছিলেন রাজীবও। তিনি পাইলট হিসেবেই জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮০ সালের বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয়ের মৃত্যু সব ওলট–পালট করে দেয়।
১৯৯১ সালে কংগ্রেসের সভাপতি হন নরসিমা রাও। রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভায় তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠনের মতো আসন কংগ্রেস পায়নি। ৫৪৪ সদস্যের লোকসভায় কংগ্রেস পায় ২৩২। বিজেপি পায় ১২০টি। কয়েকটি আঞ্চলিক দলকে নিয়ে নরসিমা রাও সরকার গঠন করেন। যদিও শারদ পাওয়ারও এই পদের দাবিদার ছিলেন।

প্রণব ছিলেন নরসিমার সমর্থক। তিনি তখন লোকসভা বা রাজ্যসভারও সদস্য ছিলেন না। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর সাইকিয়া আসামের একটি শূন্য আসন থেকে তঁাকে মনোনয়ন দিয়ে রাজ্যসভার সদস্য করেন। কিন্তু সেবারও মন্ত্রিসভায় প্রণবের ঠঁাই হলো না। তঁাকে করা হয় পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান। নরসিমা প্রণবকে বলেছিলেন, কেন তঁাকে মন্ত্রী করতে পারেননি, সেটি এখন বলা যাবে না। পরে বলবেন। প্রণব লিখেছেন, ‘মৃত্যুর আগে তিনি আর কখনোই বলেননি’।
এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের আসন আরও কমে যায়। ১৬১টি আসন পেয়ে বিজেপি নেতা অটলবিহারি বাজপেয়ি সরকার গঠন করেন। কিন্তু ১৩ দিনের মাথায় তঁার সরকার আস্থা ভোটে হেরে যায়। কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে তঁার দলকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু সমাজবাদী পার্টির মতো কিছু অ-বিজেপি দল কংগ্রেসের নেতৃত্বে সরকার গঠনের বিষয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানায়। কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে। যদিও সেই সরকারের স্থায়িত্ব ছিল কম। অন্যদিকে নরসিমার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে সীতারাম কেশরি কংগ্রেসের নতুন সভাপতি হন। সে সময় কংগ্রেসে চলছিল িবশৃঙ্খল অবস্থা। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে সোনিয়া গান্ধী প্রচারযুদ্ধে নেমেও খুব সুবিধা করতে পারেননি।

সোনিয়ার অন্তরাত্মার ডাক
২০০৪ সালে কংগ্রেস প্রথম কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। তখন সংসদীয় দলের প্রধান হিসেবে সোনিয়া গান্ধীরই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু ‘ঘরের ভেতর ও বাইরে’ থেকেই বিরোধিতা আসে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির তিনজন জ্যেষ্ঠ সদস্য শারদ পাওয়ার, পি এ সাংমা ও তারিক আনোয়ার এক বিবৃতিতে জানিয়ে দেন, বিদেশি বংশোদ্ভূত কোনো নাগরিক ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। একপর্যায়ে তঁারা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন।
প্রধান বিরোধী দল বিজেপি ঘোষণা দেয় কোনোভাবেই সোনিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া হবে না। দলের কট্টরপন্থী কয়েকজন নেতা আন্দোলনেরও হুমকি দেন। এদিকে কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা সোনিয়ার বাড়িতে গিয়ে ধরনা দেন। তঁাদের দাবি, তঁাকেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে সোনিয়া গান্ধী দলের নেতা–কর্মীদের জানিয়ে দেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন না। ২০০৪ সালের গার্ডিয়ান লিখেছিল, ‘সোনিয়া গান্ধী ডিকলাইনস ইন্ডিয়ান প্রাইম মিনিস্টারশিপ।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদ নিতে সোনিয়া গান্ধীর অস্বীকৃতি।
লিখিত বিবৃতিতে সোনিয়া বলেন, ‘গত ছয় বছরে রাজনীতিতে থাকার মধ্য দিয়ে আমার কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার যে প্রধানমন্ত্রীর পদ আমার লক্ষ্য নয়; আমি অনেকবার সে কথাটি বলেছিও। ক্ষমতা আমাকে কখনো আকৃষ্ট করে না বা সেটি আমার লক্ষ্যও নয়। আমি সব সময় এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। আজ আমি অন্তরাত্মার ডাক শুনতে পেয়েছি এবং বিনয়ের সঙ্গে এই পদ নিতে অস্বীকার করছি। আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিন; এটি আমার অন্তরাত্মার ডাক, আমার চেতনার প্রকাশ। আমার সব সময় উদ্দেশ্য ছিল আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত এবং দেশের গরিবদের সুরক্ষা দেওয়া।’
ভারত একজন বিদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিককে প্রধানমন্ত্রী করার মতো ঔদার্য দেখাতে পারেনি। তবে প্রণব বলেছেন, ১৯৯১ সালে সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে হয়তো এই বিরোধিতার মুখে পড়তেন না।

মন্তব্য

মন্তব্য