বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আপনার করনীয়

আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে উঠা এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে বাল্যবিবাহ একটি বড় বাধা। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। আজ এই একুশ শতকে এসেও বাংলাদেশের ৬৬% মেয়ে এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, যার প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। নারী শিক্ষার অগ্রগতি ব্যাহত হওয়া ছাড়াও বাল্যবিবাহের কারনে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মা হতে গিয়ে প্রতি ২০ মিনিটে একজন নারী মারা যাচ্ছে। প্রতি ঘন্টায় মারা যাচ্ছে একজন নবজাতক। অপরিনত বাড়ন্ত পুষ্ঠিহীন শরীরে বেড়ে উঠে আরেকটি অনাগত ভবিষ্যত অপুষ্ঠিগত অভিশাপের বোঝা নিয়ে জন্মগ্রহন করেছে। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক মায়ের গর্ভে প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম হয়। স্বামী, সংসার, শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কে বুঝে উঠার আগে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী সংসার এবং পরিবারের ভারে আক্রান্ত হয়। সর্বোপরি শিকার হচ্ছে পারিবারিক নির্যাতনের। বাল্যবিবাহের শিকার ছেলে ও মেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদনের মত মৌলিক মানবাধিকার লংঘিত হয়। বাল্যবিবাহ একদিকে আইন এবং সংবিধানের লংঘন। দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছর পূর্ণ এবং নারীর জন্য ১৮ বছর পূর্ণ না হলে তা বাল্যবিবাহ বলে গণ্য হয়। বাল্যবিবাহের উদ্বেগজনক পরিণতি যেহেতু পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর সেহেতু এটি অবশ্যই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ রোধে রাষ্ট্রীয় ভূমিকা ও কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয়। রাষ্ট্র সফলভাবে তৃমমূল পর্যায়ে এ্যাডভোকেসী করতে পারছে না।
একটি সুস্থ জাতি পেতে প্রয়োজন একজন শিক্ষিত মা, বলেছিলেন দার্শনিক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই তোমাদের এক প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেন, যেন তার কাছ থেকে পায় শান্তি ও সুখময় বসবাস।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৮৯) ইসলাম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নারী বা পুরুষকে প্রাপ্তবয়স্ক ও পরিপক্ব হওয়া অত্যাবশ্যকীয় বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে বাল্যবিবাহে নিরুৎসাহী করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ একটি মারাত্মক সমস্যা। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেখানে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাল্যবিবাহ ও এর পরিণতি সংক্রান্ত বিষয়ে নিস্পৃহ দৃষ্টিভঙ্গি কোন সচেতন নাগরিকের কাম্য হতে পারে না। তাই এ অবস্থা উত্তরণে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। একটু ভাবুন, আমি আপনি পরিশীলিত মূল্যবোধ নিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের জন্য কতটুকু কাজ করছি? কতটুকু দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারছি? কতজন অসহায় নারী শিশুর পাশে দাঁড়াতে পারছি? আমি আপনি যদি সবাই সচেতন হই তাহলে একটি কন্যা শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। দেশে মা ও শিশুর অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতার থেকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমাকে আপনাকেই এগিয়ে আসতে হবে। আপনার সদিচ্ছাই পারে একটি বাল্যবিবাহ রোধ করতে। আপনার একটি তথ্যই বাল্যবিবাহ মুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব। আপনার লিখিত বা মৌখিক আবেদন অথবা সংবাদের ভিক্তিতে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার অফিসার ইনচার্জ, কোন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি বাল্যবিবাহ বন্ধ সহ আইনানুগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আপনার পরিচয় গোপন রেখে বাল্যবিবাহ রোধকল্পে বিডি পুলিশ হেল্পলাইন অ্যাপ অথবা ১০৯ ফোন করে যেকোন বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত তথ্য আপনি প্রশাসনকে প্রদান করে সহায়তা করতে পারেন। তাই আসুন বাল্যবিবাহ বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করি। শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, ছাত্র, কৃষক শ্রমিক সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিবাহ বন্ধে তৎপর হতে হবে। মোটকথা বাল্যবিবাহ বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সচেতন করতে হবে পিতা-মাতাকে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। ব্যবহার করতে হবে মিডিয়াকেও। গড়ে তুলতে হবে জনসচেতনতা। এ ব্যাপারে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। জনগণের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা গেলে বাল্যবিবাহ শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব হবে। সর্বোপরি বাল্যবিবাহ রোধে নারীদেরকেই কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবারে বোঝা না হয়ে নিজেকে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হতে হবে।

মন্তব্য

মন্তব্য