এবার কি ‘হায় হায় ব্যাংক’ দেখতে হবে?

অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির রোববারের বৈঠকে দেশের দুটি বেসরকারি ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে যেসব তথ্য উত্থাপিত হলো, তা যারপরনাই হতাশাব্যঞ্জক। রোববারেই এ বিষয়ে প্রথম আলো বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংসদীয় কমিটি শুধু অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, কিন্তু আসলে প্রয়োজন বাস্তব কিছু পদক্ষেপ নেওয়া।

ফারমার্স ব্যাংকের অবস্থা এতটাই সঙিন যে আমানতকারীদের টাকা পরিশোধের ক্ষমতাও সে হারিয়ে ফেলেছে। এই ব্যাংকটি চলছে অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ ধার নিয়ে, তাকে আমানত নিতে হচ্ছে উচ্চ সুদে। নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে পারেনি বলে গত এক বছরে এই ব্যাংক ১৮ কোটি টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছে।

এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক নামের বেসরকারি ব্যাংকটির মূলধন জোগান থেকে শুরু করে ঋণ দেওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে বলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে দেওয়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে সভার কার্যবিবরণী পাস করা হয়েছে, এটাকে তিনি ‘অবিশ্বাস্য জালিয়াতি’ বলে অভিহিত করেছেন।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাজনৈতিক বিবেচনায় যেসব বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, দেউলিয়া দশাগ্রস্ত এই দুটি ব্যাংক সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির রোববারের বৈঠকে ব্যাংক দুটির চেয়ারম্যানদের অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু তাঁরা বৈঠকে উপস্থিত হননি। ব্যাংক দুটির মধ্যে ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তিনি বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি। এই কমিটির কাছে বাংলাদেশ ব্যাংককে জবাবদিহি করতে হয়। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর দেখভাল করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সে দায়িত্ব কতটা গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেছে বা করতে পারছে, তা একটা বড় প্রশ্ন। সুতরাং এ ধরনের পদে কে থাকবেন, কে থাকবেন না—সে প্রশ্নের মীমাংসা হওয়াটাও জরুরি। কেননা, জনগণের অর্থ গচ্ছিত আছে, এমন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মসম্পাদনের ওপর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি অবশ্যই প্রয়োজন। ব্যাংক দুটি এমন দুর্দশায় পতিত হওয়ার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল। এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে না পারার কারণে শেষ পর্যন্ত কি এরা হায় হায় ব্যাংকে পরিণত হবে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাংবাদিকদের বলেছেন, ব্যাংক দুটি বন্ধ হয়ে যাক, তঁারা তা চান না। কিন্তু জনগণ ব্যাংকে টাকা রাখলে সেই ব্যাংক যদি তা ফেরত দেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে, তবে তেমন ব্যাংকের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। ফারমার্স ব্যাংক ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সেই দুর্দশায় পৌঁছেছে। শুধু ব্যবস্থাপনার অদক্ষতার জন্য, বড় রকমের অনৈতিক চর্চার ফলেই এমনটা ঘটেছে। সংসদীয় কমিটির সভাপতি ব্যাংক দুটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনের সুপারিশ করেছেন। এটা ভালো সুপারিশ, তবে উভয় ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সততা-নৈতিকতাও নিশ্চিত করতে হবে। যে পরিচালনা পর্ষদের অধীনে ব্যাংক দুটির এই দুর্দশা হয়েছে, তাদেরও জবাবদিহি প্রয়োজন।

মন্তব্য

মন্তব্য