‘বাংলাদেশের প্রেমে জড়িত’ ফাদার রিগান

ফাদার মারিনো রিগন আমাদের ছেড়ে গেলেন ২০ অক্টোবর। তিনি খুব বয়সী, অসুস্থ অবস্থায় চলৎশক্তিহীন হয়ে জন্মভূমি ইতালি গেলেন। বলা ভালো, পরিবার থেকে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি প্রতিদিন এই দুঃসংবাদ শোনার জন্য ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করেছি। কারণ, একটা অপরাধবোধ পরোক্ষভাবে খুব কাজ করেছে। যে দেবতার মতো মানুষটা আমাদের কল্যাণ কামনায় জীবনপাত করলেন, তাঁর শেষ সময়ে আমরা কোনো দায়িত্ব নিতে পারলাম না। ফলে যখন তাঁর বোনেরা তাঁকে নিয়ে গেলেন, একটু অক্ষমতা, অপমানের এবং ছোট হয়ে যাওয়ার মতো হীনম্মন্যতায় ভুগতে হলো। বাস্তবতা ঠিক জানি না। তবে এটা সত্যি, তাঁর সেবা করার মতো যোগ্যতা আমাদের ছিল না। তাঁর অনুবাদ, নাগরিকত্ব, মুক্তিযোদ্ধার সম্মান ইত্যাদি নিয়ে সোচ্চার ছিলাম যথেষ্ট। ফাদার রিগন এ দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার প্রসার, চিকিৎসাসেবা ও দুস্থ নারীদের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন শাহ ও কবি জসীমউদ্‌দীনের বেশ কিছু কবিতা ও গান ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন। ১৯৭১ সালে অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা ও আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ২০০৯ সালে তাঁকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করেছে সরকার।

প্রথমে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল ফাদার কার্লো রুবিনির সঙ্গে। মিশনারি হলেও ফাদার রিগনকে আমরা সেন্ট পলস হাইস্কুল-সংশ্লিষ্ট বলে জানতাম। কারণ, তিনি ছিলেন ওই স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক (১৯৫৪-৫৭)। তিনি স্কুলেই বেশির ভাগ সময় অবস্থান করেন। অন্যদিকে, ফাদার কার্লো রুবিনির প্রধান শিক্ষকের কার্যকাল ১৯৭৬-৭৮। ফাদার কার্লো রুবিনি চলে যাওয়ার পর ওই সূত্রে ফাদার মারিনো রিগনের সাহচর্যে আসি।

ফাদার মারিনো রিগন মোংলা এলাকার উন্নয়নে ও বাংলা ভাষার কাজের জন্য সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। তিনি বোর্ডিং হাউসে অথবা পাশের ভবনে থাকতেন। আমি তখন বাউন্ডুলে। সারা দিন ক্রিকেট খেলি আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে বেড়াই। একদিন বোর্ডিং হাউসে ফাদার মারিনো রিগনের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আলাপচারিতার শেষে তাঁর ‘বাংলাদেশ’ বইটা উপহার দেওয়ার আগে ফ্ল্যাপের নিচে মূল্য লেখা অংশটি কেটে ফেলেন। খাটের ওপর ঝুঁকে কাঁচি দিয়ে ক্যাচ করে কেটে ফেলার সেই দৃশ্যটা আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। অটোগ্রাফসহ লেখকের কাছ থেকে কোনো বই এই প্রথম হাতে পেলাম আমি। এই উপহার অমূল্য সম্পদের মতো মনে হয়েছিল। লাল কালি দিয়ে শিশুর মতো হস্তাক্ষরে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেমে / জড়িত বলে সত্যজিৎকে হাতে/ দিলাম /ফাঃ রিগন/ ১৫.৭.৮৫।’ ‘বাংলাদেশের প্রেমে জড়িত বলে’ কথাটি তখন বুঝিনি। অনেক পরে তাঁকে বাংলাদেশপ্রেমী হিসেবে চিনেছি। তখন মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি অনুভব করেছি। কেননা, তাঁকে যতটা কাছে পাওয়ার, শ্রদ্ধা করার সুযোগ ছিল, তা গ্রহণ করতে পারিনি।

জন্মেই সাদা চামড়ার মানুষ দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। ১৯৫০ সালে মোংলায় দেশের দ্বিতীয় সামুদ্রিক বন্দর স্থাপনের ফলে বিদেশি নাবিক এবং তারও আগে ১৮৫৬ সালে পিমে সম্প্রদায়ের ফাদাররা আসেন মোংলা এলাকায়। ১৯২৮ সাল থেকে আসেন সালসিয়ান ফাদাররা। প্রথমে মালগাজী, পরে শেলাবুনিয়ার ক্যাথলিক মিশন চার্চে ফাদাররা নিয়মিত অবস্থান করেন।

মোংলা থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে খুলনা শহরে একসময় যাতায়াতের একমাত্র উপায় ছিল লঞ্চ। সত্তর এবং আশির দশকের কিছু সময়ে এই যাতায়াতে ব্যয় হতো গড়ে ছয় ঘণ্টা। একদিন খুলনা যাচ্ছি। ঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়ে যাওয়া এবং চলার মধ্যে একটা যাচ্ছি যাব যাচ্ছি যাব মতো ‘গজেন্দ্র গমন’ ভাব ছিল। মোংলা থেকে পরবর্তী ঘাট লাউডোব পৌঁছে কাদার মধ্যে সিঁড়ি ফেলে যাত্রী ওঠানামায় বহু সময় কেটে গেছে। লঞ্চের দোতলায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি ফাদার মারিনো রিগন। ফাদারকে যিশুপ্রণাম জানাই। উনি একটু বিরক্ত ছিলেন। কিছু কথাবার্তার পর বললেন, ‘সত্যজিৎ, বাংলাদেশের একটা অমূল্য সম্পদ রয়েছে। তা বিক্রি করে দেশ ধনী হতে পারে।’
কী ফাদার?
সময়।
লঞ্চটা তখন ‘বেগার’ দিয়ে প্রবল ভাটার উল্টোস্রোতে চলার চেষ্টা করছে। তীরে তাকিয়ে গাছপালার সরে যাওয়ার গতি অনুমান করে মনে হচ্ছিল পদব্রজে খুলনা যাচ্ছি।

সেন্ট পলস হাসপাতালের চিকিৎসকদের আবাসিক ভবন তৈরি হচ্ছিল ১৯৮৫ সালের দিকে। ঠেলাগাড়িতে শ্রমিকেরা ইট নিয়ে আসতেন দূর থেকে। উঁচু-নিচু পথের ধাক্কায় কিছু ইট পড়ে যেত। শ্রমিকেরা তা ভ্রুক্ষেপ করতেন না। কিছুদিন পর ফাদার রিগন শ্রমিকদের ডেকে বললেন, ‘একটা ইটের দাম কত জানো?’ তাঁরা কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তারপর সবাইকে ডেকে নিয়ে গেলেন আস্ত ও ভাঙা ইটের একটি ¯স্তূপের কাছে। পথে শ্রমিকদের ফেলে যাওয়া ইট বা ইটের টুকরো ফাদার একটা ঝুড়িতে করে কুড়িয়ে জড়ো করেছিলেন।

ফাদারের বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের জন্য প্রীতি নব্বইয়ের দশকে ব্যাপক পরিচিতি পায়। মোংলার আঞ্চলিক সব জাতীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রধান অতিথি করা হতে থাকে। একের পর এক তাঁর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ২০০২ সালে প্রকাশিত আমার প্রথম কাব্য ‘আপ্তবাক্য’ ফাদারকে দিয়ে আনন্দ পেয়েছিলাম।

ফাদারদের বিরুদ্ধে একটা কথা প্রচলিত ছিল যে খ্রিষ্টানদের তাঁরা বেশি সুযোগ দিতেন। বিষয়টি হয়তো সত্যি কিন্তু একদিনের ঘটনা: ফাদার মারিনো রিগনের সঙ্গে একদিন তাঁর ঘরে বসে কথা বলছিলাম। এমন সময় হলদিবুনিয়া গ্রামের এক খ্রিষ্টান ব্যক্তি ফাদারের কাছে এসে তাঁর ভাইয়ের জন্য কিছু সুবিধা দাবি করেন, যা অন্যায্য। ফাদার তা দিতে অস্বীকার করেন। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি উচ্চবাচ্য করলে ফাদার উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেন। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হই। পরক্ষণেই ঠিক আগের মতো শান্ত, ধীরস্থিরভাবে আমার সঙ্গে আলাপে যুক্ত হন। সামাজিক, ধর্মীয়, প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত কঠোর নিয়মনীতি পালনের মধ্যে একই স্থলে দুটো ভিন্ন পরিস্থিতিতে তাঁর মানসিক স্থৈর্যের যে পরিচয় পেয়েছিলাম, মহাত্মা গান্ধীর চরিত্রে এই গুণের সবিশেষ উপস্থিতি ছিল বলে জেনেছি।

ফাদার মারিনো রিগনকে বাতাসের মতন মনে হয়। যার কোনো গুরুত্ব আছে, সহসা এমনটা অনুভূত হয় না। খুবই সাধারণ, সহজ। সাদাসিধে মানুষ। আমাদের বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে তাঁকে কত হেঁটে যেতে দেখেছি। কখনো তাঁকে আলাদা কিছু মনে হয়নি। আলাদা করে কিছু মনে না হওয়াই তাঁকে সবার থেকে পৃথক করেছে। বাতাস থেকে অক্সিজেন বের করে নিলে মানুষের যে অবস্থা হবে, ফাদারের সমস্ত অবদান তুলে নিলে মোংলা এলাকারও ওই একই পরিণতি হবে। তাই তিনি আমাদের জন্য অনন্য জীবন এক।

ফাদার মারিনো রিগন বাগেরহাট মোংলা এলাকায় আসেন ১৯৫৩ সালে। তখন এই এলাকা ঠিক জনপদ ছিল না, ছিল জঙ্গল। এলাকাবাসী দুর্ধর্ষ ডাকাত হিসেবে খ্যাত ছিল এবং আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করে সুন্দরবনে শিকারে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সে সময় ফাদার মারিনো রিগন এবং তাঁর মতো কয়েকজন মিশনারি কীভাবে মোংলা থানার মালগাজী গ্রাম পর্যন্ত যাতায়াত করেছেন, তা চিন্তা করাও কঠিন। অবশ্য সত্তরের দশকে ফাদাররা কখনো-সখনো স্পিডবোটে যাতায়াত করতেন। ভালো মানুষের কিছু শত্রু তৈরি হবেই। বিরুদ্ধাচারীরা খালের পাড় ভাঙা, জেলেদের মাছ ধরা এবং নৌকা চলাচলে অসুবিধার অজুহাতে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ করে দেয়। মোংলা এলাকার উন্নয়ন এবং তাতে ফাদার মারিনো রিগনসহ অন্যান্য ফাদারের অবদান সম্পর্কে জানলে ততটা বেমানান মনে হয় না। এখন মনে হয় খাল কেন, আমাদের বুকের রক্তনদী দিয়ে হলেও তাঁদের চলাচল অব্যাহত রাখার প্রয়োজন ছিল।

মন্তব্য

মন্তব্য